একটি বাঘ শিকারের অনুমতি মিলত মাত্র ১৫০ টাকায়। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে একসময় বাঘ শিকারকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল লাভজনক পর্যটন ব্যবসা। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আশায় দীর্ঘদিন ধরে ভারতে চালু ছিল এই ব্যবস্থা। এতে নির্বিচার শিকার, বনাঞ্চলের ওপর চাপ এবং বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে অভিজাতদের শিকার সংস্কৃতি। অথচ আজ সেই বাঘের অস্তিত্ব রক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে সংরক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে ভারত। ভারতে বাঘ সংরক্ষণের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৭৩ সালে। ওই বছর চালু হয় ‘বাঘ বাঁচাও’ প্রকল্প। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে শিকার ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে দেশটিতে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতে বাঘের সংখ্যা আনুমানিক ৪০ হাজার থাকলেও ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তা নেমে আসে মাত্র ১ হাজার ৮২৭টিতে। বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে ব্রিটিশ শাসনামলের শিকার উৎসব, দেশীয় রাজা-মহারাজাদের শিকার প্রবণতা এবং স্বাধীনতার পরও চালু থাকা বাণিজ্যিক শিকার ব্যবস্থাকে দায়ী করেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শিকারই ছিল আভিজাত্যের প্রতীক
ব্রিটিশ শাসনামলে বাঘ শিকার ছিল ক্ষমতা, সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম। ব্রিটিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে দেশীয় রাজা-মহারাজা ও বিত্তশালীদের কাছে বাঘ শিকার ছিল জনপ্রিয় বিনোদন। শিকারের পর বাঘের চামড়া, মাথা কিংবা অন্যান্য দেহাংশ সংরক্ষণ করে বাড়ির বৈঠকখানায় সাজিয়ে রাখা হতো। এগুলোকে শিকারের সাফল্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও এই সংস্কৃতির অবসান ঘটেনি। স্বাধীন ভারতের সরকারও একসময় বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে শিকারভিত্তিক পর্যটনকে কাজে লাগায়। তখন দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ছিল প্রকট। সেই ঘাটতি মোকাবিলায় বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ আয়ের বিভিন্ন পথ খোঁজা হচ্ছিল। এরই অংশ হিসেবে বাঘ শিকারের সুযোগকে আকর্ষণীয় পর্যটন পণ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
১৫০ টাকায় বাঘ শিকারের অনুমতি
একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৫৭ সালে রাজস্থান সরকার বন্যপ্রাণী শিকারের জন্য নির্দিষ্ট মাশুল চালু করেছিল। সে সময় একটি বাঘ শিকারের জন্য দিতে হতো ১৫০ টাকা। একটি চিতাবাঘ শিকারের মাশুল ছিল ৩৫ টাকা। ভালুক কিংবা শম্বর হরিণ শিকারে খরচ পড়ত ৫০ টাকা। আর চিতল হরিণ বা নীলগাই শিকারের জন্য দিতে হতো ৩০ টাকা।
তবে ইচ্ছা করলেই যে কেউ জঙ্গলে গিয়ে শিকার করতে পারতেন না। এ জন্য প্রয়োজন হতো সরকারি অনুমতিপত্র, নির্দিষ্ট শিকারক্ষেত্রের ব্যবস্থা এবং অভিজ্ঞ পেশাদার শিকারির সহায়তা। ফলে বন্যপ্রাণী শিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি সুসংগঠিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থা।
৬২০ ডলারে ১০ দিনের শিকার অভিযান
বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে বিশেষ করে মার্কিন নাগরিকদের কাছে ভারতের বাঘ শিকার ছিল বেশ আকর্ষণীয়। তাঁদের জন্য ১০ দিনের শিকার অভিযানের আয়োজন করত সরকার-অনুমোদিত বিভিন্ন সংস্থা ও শিকারি প্রতিষ্ঠান।
‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর পুরোনো এক প্রতিবেদনে সাংবাদিক রবার্ট ট্রাম্বুলের ‘বিগ গেম ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক ভ্রমণলেখায় এই শিকার পর্যটনের বিবরণ উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, জনপ্রতি ৬২০ ডলারের বিনিময়ে ১০ দিনের জঙ্গল অভিযানের ব্যবস্থা করা হতো। সে সময়ের হিসাবে এই অর্থের মূল্য ছিল প্রায় তিন হাজার টাকা। পানীয় ও সিগারেট ছাড়া প্রায় সব খরচই এই প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিদেশি পর্যটকদের কাছে শিকারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে নানা ধরনের প্রচার চালানো হতো। শিকার অভিযানে গিয়ে বাঘ হত্যার অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সেই শিকারের স্মারক হিসেবে বাঘের চামড়া নিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ ছিল তাঁদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। শিকারভিত্তিক পর্যটনের এই প্রসার সম্পর্কে ২০২১ সালে ‘স্যাঙ্কচুয়ারি এশিয়া’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক লেখায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ আদিত্য পাণ্ডা উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর ভারতে বাণিজ্যিক শিকার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছিল। বিশেষ করে মার্কিন পর্যটকদের চাহিদা এই ব্যবসার প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল।
বাঘ কমার দায় শুধু স্থানীয়দের নয়
ভারতে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য প্রায়ই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিকারকে দায়ী করা হয়। তবে সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশ মনে করেন, বাঘের অস্তিত্ব সংকটের পেছনে ঔপনিবেশিক শাসন, রাজা-মহারাজাদের শিকার এবং স্বাধীনতার পর অভিজাতদের জন্য চালু থাকা বাণিজ্যিক শিকার পর্যটনের দায়ও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিনের নির্বিচার শিকার বাঘের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একসময় যে প্রাণিকে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই প্রাণীকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হয় সরকারকে।
সংরক্ষণ প্রকল্পে ফিরেছে বাঘের সংখ্যা
১৯৭৩ সালে বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প চালুর পর ভারতের বিভিন্ন অভয়ারণ্য ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার হয়। সর্বশেষ ২০২২ সালের বাঘ গণনার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বাঘের সংখ্যা আনুমানিক ৩ হাজার ১৬৭ থেকে ৩ হাজার ৯২৫টির মধ্যে বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭৫ শতাংশই ভারতে রয়েছে বলে সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
বাঘের সংখ্যা নিরূপণে ষষ্ঠ জাতীয় গণনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে এর ফলাফল প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
একসময় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আশায় যে বাঘকে শিকারের পণ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, আজ সেই বাঘই ভারতের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের অন্যতম প্রতীক। ইতিহাসের এই পালাবদল দেখিয়ে দেয়, মানুষের বিনোদন ও বাণিজ্যিক স্বার্থ কীভাবে একটি বন্যপ্রাণিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে, আবার পরিকল্পিত সংরক্ষণ কীভাবে তার অস্তিত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।