অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখবেন যেভাবে

317

বিশ্বের প্রায় ১০ কোটি লোক শ্বাসনালির সচরাচর সমস্যা অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়। তাদের ৯০%-এরও বেশি অত্যাধুনিক চিকিৎসা পায় না এবং অনেক রোগী মারা যায়। যদিও এ মৃত্যুর ৮০% প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি আধুনিক চিকিৎসা ও ডাক্তারের তদারকির মাধ্যমে অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়া যায়।
অ্যাজমা কী?
অ্যাজমা বা হাঁপানি আসলে শ্বাসনালির অসুখ। যদি কোনো কারণে শ্বাসনালিগুলো অতিমাত্রায় সংবেদনশীল (হাইপারসেনসিটিভ) হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনায় উদ্দীপ্ত হয় তখন বাতাস চলাচলের পথে বাধার সৃষ্টি হয়, ফলে শ্বাস নিতে বা ফেলতে কষ্ট হয়।
কেন হয়?
জেনেটিক পরিবেশগত কারণে কারো কারো বেশি হয়ে থাকে। ঘরবাড়ির ধুলা-ময়লায় মাইট জীবাণু, ফুলের বা ঘাসের পরাগরেণু, পাখির পালক, জীবজন্তুর পশম, ছত্রাক, কিছু কিছু খাবার, কিছু কিছু ওষুধ, নানা রকম রাসায়নিক পদার্থ ইত্যাদি থেকে অ্যালার্জিজনিত অ্যাজমা হয়ে থাকে।
কাদের হতে পারে হাঁপানি?
যে কোনো বয়সের স্ত্রী, পুরুষ, শিশু-কিশোর যে কারো হতে পারে। যাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের হাঁপানি আছে তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আবার দাদা-দাদির থাকলে (বাবা-মার না থাকলেও) নাতি-নাতনি বা তাদের ছেলেমেয়েরা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পিতৃকুলের চেয়ে মাতৃকুল থেকে হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
অ্যাজমায় কেন এ শ্বাসকষ্ট?
আমাদের শ্বাসনালিগুলো খুবই ক্ষুদ্র। ২ মিলিমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট। চারদিকে মাংসপেশি পরিবেষ্টিত। এ ক্ষুদ্র শ্বাসনালির ভেতর দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় খুব সহজেই বাতাস আসা-যাওয়া করতে পারে। যদি কখনো অ্যালার্জিক বা উত্তেজক কোনো জিনিস শরীরে প্রবেশ করে তখন শ্বাসনালির মাংসপেশিগুলো সংকুচিত হয়। ফলে শ্বাসনালি সরু হয়ে যায়। তা ছাড়া উত্তেজক জিনিসের প্রভাবে শ্বাসনালির গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় আঠালো মিউপাস জাতীয় কফ, আরইনফেকশনের কারণে শ্বাসনালির ভেতরের দিককার মিউকাস আরবণী আঠালো কফ উঠিয়ে ফেলার লক্ষ্যে অনবরত কাশি হয়ে থাকে। কখনো কখনো এ শ্বাসনালি এত সরু হয় যে বাতাস বায়ুথলিতে পৌঁছায় না, তখন শরীরে অক্সিজেনের অভাব হয়। এটা খুবই মারাত্মক অবস্থা। এ অবস্থা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলে অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে।
অ্যাজমা কি ছোঁয়াচে রোগ?
না, অ্যাজমা ছোঁয়াচে রোগ নয়। পারিবারিক বা বংশগতভাবে অ্যাজমা হতে পারে। কিন্তু ছোঁয়াচে নয়। অ্যাজমায় আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ খেয়ে শিশুদের অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। মায়ের সংস্পর্শ থেকেও হওয়ার আশঙ্কা নেই।
বংশগতভাবে অ্যাজমার ঝুঁকি কতটা?
মাতৃকুলে হাঁপানি থাকলে তিন গুণ বেশি রিস্ক আর পিতৃকুলে হাঁপানি থাকলে অনেকটা কম রিস্ক। মায়ের হাঁপানি থাকলে মোটামুটিভাবে বলা হয় তিন সন্তানের মধ্যে একটির হাঁপানি, একটির আপাত সুস্বাস্থ্য এবং একটির অস্বাভাবিক শ্বাসনালির সংকোচন থাকতে পারে। শেষেরটির হাঁপানি না হয়ে সর্দি-কাশির প্রবণতা থাকতে পারে।
কিভাবে এ রোগ চিহ্নিত করা যায়
অ্যাজমা রোগের প্রধান উপসর্গ বা লক্ষণগুলো হলোথ
০ বুকের ভেতর বাঁশির মতো সাঁই সাঁই আওয়াজ।
০ শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট।
০ দম খাটো অর্থাৎ ফুসফুস ভরে দম নিতে না পারা।
০ ঘন ঘন কাশি।
০ বুকে আঁটসাঁট বা দমবন্ধ ভাব।
০ রাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকা।
আপনার হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে বুঝবেন কিভাবে? উপশমকারী ওষুধের পরিমাণ বাড়তে থাকা এবং ইনহেলার দ্বারা উপশম তিন-চার ঘণ্টার বেশি না থাকা। রাতে শ্বাসকষ্টে ঘুম ভেঙে যাওয়া, স্বাভাবিক কাজকর্মে শ্বাসকষ্ট হওয়া। পিক ফ্লো ধীরে ধীরে কমা। এসব উপসর্গের উপস্থিতি মানে আপনার হাঁপানি আর নিয়ন্ত্রণে নেই।
অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কী বিপদ হতে পারে?
মারাত্মক জটিল অ্যাজমা হতে পারে। স্থায়ী পুরনো অ্যাজমায় পরিবর্তন হতে পারে। স্থায়ী পুরনো অ্যাজমা থেকে হার্ট ফেইলিওর হয়ে পানি আসতে পারে এবং রোগী শয্যাশায়ী হয়ে যেতে পারে। শরীরে সব সময় অক্সিজেন কম থাকতে পারে। তাই সব সময় অবসাদগ্রস্ত মনে হবে।
অক্সিজেনের অভাবে স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে এবং অকালে নিজেকে বৃদ্ধদের মতো দুর্বল মনে হবে। ফুসফুসের অংশবিশেষ চুপসে যেতে পারে। নিউমোনিয়াও হতে পারে। পায়ে পানি আসতে পারে। মুখ থেকে ছিটেফোঁটা রক্ত বেরিয়ে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে কাশি বন্ধ করার ওষুধটা দেয়া জরুরি।
মারাত্মকভাবে আক্রান্ত কি না বুঝবেন কিভাবে?
যখন উপমশকারী ইনহেলার ব্যবহার করে ৫-১০ মিনিটের ভেতর শ্বাসকষ্ট লাঘব হচ্ছে না তখন বুঝতে হবে আপনার হাঁপানি মারাত্মক অবস্থা ধারণ করতে যাচ্ছে।
রোগীর সঠিক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ অ্যাজমার উপসর্গ ও তীব্রতা পরিবর্তিত হয়, ফলে চিকিৎসা পরিবর্তন হতে পারে। অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। নতুন সংযোজন, পুনঃপরীক্ষণ এবং তাগিদের দরকার হতে পারে।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কী?
০ রক্ত পরীক্ষা : বিশেষত রক্তে ইয়োসিনোফিলের মাত্রা বেশি আছে কি না তা দেখা
০ সিরাম আইজিইর মাত্রা : সাধারণত অ্যালার্জি রোগীদের ক্ষেত্রে আইজিইর মাত্রা বেশি থাকে
০ স্কিন প্রিক টেস্ট : এ পরীক্ষায় রোগীর চামড়ার ওপর বিভিন্ন অ্যালার্জেন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং এ পরীক্ষায় কোন কোন জিনিসে রোগীর অ্যালার্জি আছে তা ধরা পড়ে
০ প্যাস টেস্ট : এ পরীক্ষা রোগীর ত্বকের ওপর করা হয়
০ বুকের এক্স-রে : হাঁপানি রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরুর আগে অবশ্যই বুকের এক্স-রে করে নেয়া দরকার যে অন্য কোনো কারণে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কি না
০ স্পাইরোমেট্রি বা ফুসফুসের ক্ষমতা দেখা : এ পরীক্ষা করে রোগীর ফুসফুসের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায়
অ্যাজমার জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা?
উপশমকারী ওষুধ ৫-১০ মিনিট পর আবার নিতে হবে। নিজেকে শান্ত রাখুন, স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে চেষ্টা করুন। যেভাবে বসলে আরাম লাগে সেভাবে বসুন। আপনার হাত হাঁটুর ওপরে রাখুন, যাতে সোজা হয়ে বসে থাকতে পারে। শ্বাস তাড়াহুড়া করে নেবেন না, তাড়াহুড়া করে শ্বাস নিলে অবসাদগ্রস্ত হয়ে যাবেন। যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার বা সাহায্যকারীর শরণাপন্ন হোন।