সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হাম, শ্বসকষ্টের সংক্রমণ ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ভিড়ে চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। সবমিলিয়ে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৬৫০ জন রোগী ভর্তি আছেন বলে খোদ তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৬ জন শিশু। তাদের মধ্যে ছেলে ১৩ জন ও মেয়ে ৩ জন। এর আগের দিন ভর্তি ছিল ৭১ জন। তাদের মধ্যে ৪১ জন ছেলে ৩০ জন মেয়ে। তাদের মধ্যে সুস্থ হওয়ায় ৭ জন ছেলে ও ৪ জন মেয়েসহ ১১ জনকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। এছাড়া অবস্থার অবনতি হওয়ায় দুজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে এই হাসপাতালে ৭৪ জন রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ৪৫ জন ছেলে ও ২৯ জন মেয়ে রয়েছে। হামে আক্রান্তদের সিংহভাগই শিশু।
সূত্রটি আরো জানায়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ২৬৬ জন রোগী জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে রাজশাহীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে সিভিল সার্জন অফিসের ডায়রিয়া বিষয়ক প্রতিদিনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে জেলা হাসপাতালে ৬৮ জন, শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন, গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন, নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭ জন ও ভোলাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে জেলা হাসপাতালেই ভর্তি আছেন ৬৯ জন রোগী।
অপরদিকে শ্বাসকষ্টজনিত রোগেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৯ জন রোগী। তাদের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ ও ১৬ জন নারী রয়েছেন।
এদিকে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দেশের জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ব্যবস্থা চালু না থাকায় কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ হলেই তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হামে আক্রান্তদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন— হামের পরীক্ষা একমাত্র ঢাকার মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে হয়। আমরা এখানকার রোগীদের স্যাম্পল সংগ্রহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিদের কাছে দিচ্ছি। তারা মহাখালী নিয়ে যাচ্ছেন। পরীক্ষা রিপোর্ট তিন মাস পর পাওয়া যায়। কিন্তু ততদিন তো রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে থাকা যায় না। তাই আমরা চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র রয়েছে।
তিনি আরো জানান, অন্যবার রোজার মাসে রোগীর সংখ্যা কমে যায়। কিন্তু এবার বাড়ছে। হাম ছাড়াও ডায়রিয়া ও শ্বসকষ্টজনিত রোগীও প্রচুর। বর্তমানে হামের রোগীদের জন্য ৮ জন নার্স নিযুক্ত করা হয়েছে এবং শিশু ওয়ার্ডে ২ জন বিশেষজ্ঞ ও ১ জন মেডিকেল অফিসারসহ তিনজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াটা পর্যন্ত রোগী দেখার সময় হলেও বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রোগী দেখছেন। বর্তমানে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৫০ জন।
এদিকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজ রায়হান তার ফেসবুক আইডিতে রোগীদের অভিভাবকদের নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টে তিনি বলেন, “আমরা আসলেই অদ্ভুত এক জাতি। ২ মাস আগে যখন ৫-৭টা ঝঁংঢ়বপঃবফ গবধংষবং (হাম) সাসপেকটেড হাম আক্রান্ত বাচ্চা ভর্তি থাকতো, তখন মাত্র এ কয়টা রোগী সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। এই রোগের লক্ষণ কমতে বেশ সময় লাগে, এজন্য অভিভাবকরা অভিযোগ, ঝগড়া, অশালীন আচরণ করতেই থাকতেন। ডাক্তার, নার্সের সাথে ঝগড়া, বেড পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে অভিভাবকরা একে অপরের সাথে একরকম যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। কিন্তু গত ৩ সপ্তাহে চিত্র বদলে গেছে। অভিভাবকরা রোগটা সম্পর্কে বুঝতে শিখেছেন, ধৈর্য ধরতে শিখে গেছেন। মনের ভিতর তীব্র ভয়, শঙ্কা থাকলেও ধৈর্য সহকারে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন এবং হাসপাতালের নিয়ম মানছেন। অভিভাবক রা একে অপরকে সহযোগিতা করছেন, খাবার ভাগ করে খাচ্ছেন, বিছানা শেয়ার করছেন, একে অপরকে কাউন্সেলিং করছেন। অভূতপূর্ব চিত্র। মহান আল্লাহ এই অসুখ থেকে আমাদের রক্ষা করবেন ইনশাআল্লাহ।”
প্রসঙ্গত, হামের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে— প্রথমে জ্বর হয় ও শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে বা হালকা ব্যথা লাগে। প্রথম এক-দুই দিন তীব্র জ্বরও হতে পারে। চোখ-মুখ ফুলে উঠতে পারে। চোখ লাল হয়ে যেতে পারে, চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে। নাক দিয়ে পানি পড়তে পারে এবং হাঁচিও হতে পারে। শরীরে ছোট ছোট লালচে গুটি/ফুসকুড়ি দেখা দেয় এবং দ্রুতই তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ সময় বিশেষত শিশুরা কিছুই খেতে চায় না এবং ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।