সুলিভান ব্রাদার্সের বাংলাদেশে আসার গল্প শুরু

টাইব্রেকারে শেষ শট গোল দিলেই বাংলাদেশের হাতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো অনূর্ধ্ব- ২০ দক্ষিণ এশিয়ান পুরুষ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি। আলতো ছোঁয়ায় দারুণ আত্মবিশ্বাসী শট নেন রোনান সুলিভান, বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস। ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ- এই ম্যাচের গ্যালারি দেখে মনেই হতে পারে যেন বাংলাদেশ স্বাগতিক দেশ। কারণ মালদ্বীপের মালে শহরের জাতীয় স্টেডিয়ামের দর্শকসারির একটা বড় অংশজুড়ে ছিলেন মালদ্বীপে পেশার খাতিরে পারি জমানো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আর শেষ শটটিও নিয়েছেন এক প্রবাসী বাংলাদেশি, যিনি আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশের জার্সি গায়ে খেলবেন, এটা নিশ্চিত ছিলেন না দুই মাস আগেও। ১২ নম্বর জার্সি পরা রোনান সুলিভান যেভাবে শেষ শটে ভারতীয় যুব দলের গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেন, এই শটটি ঐতিহাসিকভাবে ফুটবলে পানেনকা হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার আন্তোনিন পানেনকা এমনভাবে শট নেন যেটা ডানেও না বামে না, একদম আলতো টোকায় গোলরক্ষক বরাবর মারা হয়, এতে ধীরগতি ও আগেই একদিকে ঝাঁপ দেওয়ার কারণে মিস করেন কিপার।
ঠিক এই শটের পুনরাবৃত্তি ঘটান রোনান সুলিভান। সুদূর আমেরিকা থেকে তার ভাই কুইন সুলিভান খেলা দেখছিলেন ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের ড্রেসিংরুম থেকে, সেখানে তার পোস্ট করা ভিডিওতে চিৎকার করে বলেন, ‘চিপ ইট’ অর্থাৎ বল চিপ করো, রোনান করলেন তাই, বাংলাদেশের একটি দলের জয়ের উল্লাস দেখা গেছে আমেরিকান ফুটবলের সর্বোচ্চ লিগের একটি দলের ড্রেসিংরুমে। রোনান এর আগে বাংলাদেশের হয়ে দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে ফাইনালে আনার পেছনে বড় অবদান রাখেন। শিরোপা জয়ের পেছনে অবদান ছিল বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব- ২০ জাতীয় দলের গোলকিপার ইসমাইল হোসেইন মাহিনেরও। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় কোনো পক্ষ গোল দিতে পারেনি, টাইব্রেকারে তিনি ভারতীয় দলের প্রথম পেনাল্টি ঠেকিয়ে বাংলাদেশ দলের শিরোপা জয়ের আশা জাগিয়ে তোলেন।
খাবারের ভিডিও থেকে বাংলাদেশ দলে
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় বেড়ে ওঠেন কুইন সুলিভান। সুলিভান ভাইদের মধ্যে এখন কুইন সবচেয়ে জনপ্রিয়। এমনকি অনেকে আশা করছেন তিনি এবারে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলেও খেলতে পারেন। ইতোমধ্যে তিনি যুব বিশ্বকাপ খেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এবং নিয়মিত ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে মেজর সকার লিগে খেলছেন, যেই লিগে খেলছেন লিওনেল মেসি। ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকেই এই তরুণ ফুটবলারের গল্পে হঠাৎ করেই উঠে এসেছে বাংলাদেশের কথা।
লিওনেল মেসির বিপক্ষে মাঠে কুইন সুলিভান
স্থানীয় ক্লাব ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের একটি ভিডিওতে খাবারের স্বাদ নিতে গিয়ে নিজেদের পারিবারিক শিকড়ের কথা বলতে গিয়ে আলোচনায় আসে তাদের বাংলাদেশি বংশসূত্র। এরপরই শুরু হয় অনুসন্ধান, যা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন পর্যন্ত। সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ফিলাডেলফিয়ার এক প্রবাসী বাংলাদেশির পরিচালিত লবঙ্গ কাবাব অ্যান্ড ক্যাফেতে বসে আছেন কুইন। সামনে ধোঁয়া ওঠা নান, সঙ্গে গরু ও খাসির ঝোল। খেতে খেতেই তিনি গল্প করছিলেন নিজের শিকড় নিয়ে, বাংলাদেশের সঙ্গে তার নাড়ির টান নিয়ে। সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও পরে প্রকাশ করে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কুইন তখন সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও ভালোবেসে তার নানীর কথা বলেছিলেন। তিনি জানান, তার নানী ঢাকার মেয়ে। সেখান থেকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে, ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় এবং সেখান থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি জাতিসংঘেও কাজ করেছেন। পরে জানা যায়, কুইনের সেই নানীর নাম সুলতানা আলম। তিনি বিয়ে করেন ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ার জার্মান অধ্যাপক ক্লাউস ক্রিপেনডর্ফকে। সুলিভানরা চার ভাই- রোনান ও ডেক্ল্যান এখন বাংলাদেশ বয়সভিত্তিক দলের সাথে, আর কুইন ও ক্যাভান সুলিভান যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল খেলছেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ডিজিটাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য অমিত হাসান জানান, এই চার ভাইয়ের নানী সুলতানা আলম একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় পড়াশোনা করতে গিয়ে এক জার্মান প্রফেসরকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির মেয়ের ঘরে জন্ম চার ভাইয়ের, যারা এখন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল খেলায় নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলছেন। বাংলাদেশি ক্রীড়া প্রতিবেদক রিফাত মাসুদ বলেন, একটি ভিডিওতে খাবারের স্বাদ নিতে গিয়ে নিজেদের পারিবারিক শিকড়ের কথা তুলে আনার বিষয়টি একটি অনলাইন পেইজ সেইভ বাংলাদেশ ফুটবল প্রথমে খেয়াল করে। ক্লাবের ভিডিওতে তাদের বাঙালি পরিচয়ের ইঙ্গিত পাওয়ার পর পেইজটি সুলতানা আলমের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। সেখান থেকেই এই ফুটবলারদের সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের যোগাযোগের পথ তৈরি হয়। সুলিভান পরিবারে ফুটবল যেন রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। তাদের বাবা ব্রেন্ডান সুলিভান অস্ট্রেলিয়ার এ লিগে ছয় বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে পাঁচটি ক্লাবে খেলেছেন। এর আগে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় খেলেছেন এবং পরে কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মা হেইকে ডিভিশন ওয়ান পর্যায়ে ফুটবল খেলেছেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী দলের অধিনায়ক ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে কুইন সুলিভান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুব দলে খেলেছেন এবং ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে মাঠে নামছেন। তার ছোট ভাই ক্যাভানও যুক্তরাষ্ট্রের যুব আন্তর্জাতিক দলে খেলেন, বলা হয়ে থাকে এই ক্যাভান নাকি এই চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান। বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন যমজ ভাই ডেকলান ও রোনান, তারা আমেরিকায় বর্তমানে ওয়াইএসসি একাডেমিতে পড়াশোনা করছেন এবং এমএলএস নেক্সটের সহযোগী ক্লাব এফসি ডেলকোর হয়ে খেলছেন। এই পরিবারের পরিবারের ফুটবল ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত। তাদের চাচাতো ভাই ক্রিস অলব্রাইট যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ফুটবলার ছিলেন এবং ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলেছেন। এছাড়া তাদের নানা ল্যারি সুলিভান ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।