সূরা ইয়াসীন-এর ফজিলত ও আমল

222

সূরা ইয়াসীন হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর নবুয়ত লাভের প্রথম দিকে এবং হিজরতের বহু আগে মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর আয়াত সংখ্যা তিরাশি এবং রুক্কু পাঁচটি। সূরাটিকে ‘কুলবুল কুরআন’ বা কুরআনের অন্তঃকরণ বলা হয়। বাস্তবিকই এই সূরায় কোরআনিক শিক্ষার প্রাণবস্তু তওহিদ, রিসালাত, হেদায়েত, নবুয়ত এবং ইহকাল-পরকাল সম্পর্কে সারগর্ভ আলোচনা রয়েছে। ইয়াসীন শব্দের অর্থ ‘হে মানব’ মতান্তরে ‘হে মুহাম্মদ (স.)। হক বা সত্যের উন্নতি-অগ্রগতি কখনো ব্যাহত হয়না। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর বেলায়ও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। জানা যায়, সকল যুগের সকল নবী-রাসূলদেরকেই সমসাময়িক কালের লোকদের দ্বারা দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত হতে হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবীজি (স.)ও আল্লাহর নির্দেশিত চিরন্তন সত্য- সুদৃঢ় পথে মানবজাতিকে পরিচালিত করতে গিয়ে বিরোধিতায় পড়েছেন, বাঁধাগ্রস্ত হয়েছেন। যারা নবীজি (স.)-এর বিরোধিতা করেছেন তাঁরা এর আগেও খৃষ্টান, ইহুদি বা অন্য কোন ধর্মের নীতিও মেনে চলেনি। প্রবীণরা দীর্ঘদিনের অভ্যাস, সংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে পারেনি। আর এসব মহাপাপী, অন্ধ বিশ্বাসী ও হঠকারীদের সত্য ও ন্যায়ের প্রতি চরম বিরোধিতার কথাই এ সূরা প্রথমাংশে আলোচিত হয়েছে। এ সূরায় এমন এক জনপদের কথা বলা হয়েছে,যেখানে উপর্যুপরি তিনজন সতর্ককারী নবী প্রেরীত হওয়ার পরও এর অধিবাসীরা ধর্মের বাণীতে কর্ণপাত করেনি। যেকোন সময় আল্লাহ তা’য়ালা যেকোনটিই সৃষ্টি অথবা ধ্বংস করতে পারেন। সৃষ্টির জন্যে যেমন কোন সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন পড়েনা তেমনি ধ্বংসের বেলায়ও আল্লাহর পক্ষে সময়ক্ষেপনের দরকার হয়না। সংস্কার-প্রচেস্টার প্রতি মানুষের মনের স্বাভাবিক বিরোধ-প্রবণতা অপরিসীম। নতুন বলতে যদি কোন কিছু শাশ্বত,সুন্দর, সত্যের সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্টা লাভ করে তা হলে পুরাতনকে পরাজয় বরণ করতে হয়। সুতরাং জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান নারী-পুরুষের পক্ষে শুধু নতুন বলে কোন মত বা পথের বিরোধিতা করা উচিত নয়। সূরাটির প্রায় মাঝামাঝিতে সৃষ্টি সম্পর্কিত মানুষের অস্বচ্ছ ধারণা উদঘাটিত হয়েছে। বলা হয়েছে, সকল সৃষ্টিই যুগল-সৃষ্টি। বস্তু, প্রাণী, অণু-পরমাণু এবং জানা-অজানা সবকিছুই জোড়ায়-জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি, সূরাটিতে মহাশুন্যে চন্দ্র-সূর্য্য উভয়ই নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমন করা ছাড়াও সূর্য্য নিজ মেরুদন্ডে ছাব্বিশ দিনে একবার ঘুরে আসে একথাও বলা হয়েছে। তাছাড়া এই সূরায় প্রচ- আঘাতে সারা পৃথিবী প্রকম্পিত হওয়া, সকল মানবজাতি পুনর্জীবিত হয়ে ময়দানে হাশরে সমবেত হওয়া, শান্তি বা পুরস্কার লাভ, বেহেশতের সুখ-ভোগ, নারী-পুরুষের কৃতকর্ম এবং নেকি-বদি প্রমাণের জবানবন্দি বা অন্য কোন সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন না হওয়া, নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত দৈহিক অঙ্গ-প্রতঙ্গের নিজ নিজ ভূমিকা বর্ণনা করা, সামান্য শুক্রকণা হতে একান্ত অসহায় মানব সৃষ্টির রহস্য এবং পরবর্তীতে বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাতে আরো বর্ণনা করা হয়েছে, নবী কখনো কবি বা কাব্যবিদ নয়। তাঁর বাণী শাশ্বত সত্যের ভাস্কর প্রকাশ। আর কোরআন যাতে অতি সহজ-সরলভাবে ধর্মীয় মৌলিক নীতিগুলো বর্ণিত ও ব্যাখ্যায়িত হয়েছে। জড়বাদি কাফিরদের ব্যাপারেও সূরাটিতে আলোচনা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমি আলোচনা দীর্ঘায়িত করবো না। বলবো, বান্দা এবং তাঁর সৃষ্টিকর্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ মাধ্যম বা সরল পথ-পন্থা নির্ধারণের বিষয়ে। এবিষয়ে বলতে গেলে ইসলাম প্রত্যেক মানুষকেই ব্যক্তি স্বাধীনতা দান করেছে। অর্থাৎ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষই স্বাধীন। আমরা জানি, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য আজো পর্যন্ত মানুষ অবিছিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম করে চলেছে। কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে সেই ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ ইসলাম চৌদ্দশত বছর আগেই স্বীকার করে নিয়েছে। অধ্যাÍ জগতের এই ব্যক্তিবাদ বস্তুজগতে ব্যক্তি স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। সর্বশেষ এই সূরার শেসাংশে জলবায়ু, আগুন এবং আগুন তৈরির কলাকৌশল বর্ণিত হয়েছে। জলবায়ু পাওয়াটা সহজলভ্য হলেও আগুন মানুষকে তৈরি করে নিতে হয়। মানুষের আদি ও আসল বাসস্থান মধ্য প্রাচ্য বা আরব যেখানে পত্র-পল্লববিহীন শাখা-প্রশাখাযুক্ত এক ধরনের গাছ চোখে পড়ে। প্রথমত এই গাছের দু’টুকরো শাখা কেটে নিয়ে পরস্পর ঘর্ষণ দ্বারা মানুষ প্রয়োজন মতো আগুন উৎপাদন করতে শিখে। একই গাছের দু’টুকরো শাখাকে একটি অন্যটির খুদিত গর্তের ভেতর ঘুরিয়ে আরবীয়রা আগুন উৎপাদন করেছিল। আর এই যন্ত্রটির নাম ছিল ‘জিনাদ’। আজ এরই ধারাবাহিকতায় মানুষ কালক্রমে বাঁশে-বাঁশ, পাথরে-পাথরে লৌহ-ইস্পাতে ঘর্ষণের সাহায্যে আগুণ উৎপাদনের সহজ প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছে। অতএব, সবুজ গাছের পরস্পর শাখা হতে যিনি আগুন উৎপাদন করতে সক্ষম তিনি বা তাঁর পক্ষে প্রাণহীন দেহ বা অস্থি- কংকাল হতে মানুষকে পুণঃবার সৃষ্টি করা মোটেও অসম্ভব নয়। এই সূরার নিত্য-আবৃত্তি এবং মর্মকথা বুঝা সীমাহীন নেককাজ। এর ভক্ত মুসলমানরা অতি বিশ্বাসের সঙ্গে আপতিত বিপদাপদ এবং নানা দুঃখকষ্টে তা পাঠ করে হৃদয় বা মনে সাহস জোগানোর মাধ্যমে আল্লাহর অপার করুণা লাভের ভরসা করে থাকেন। জীবনের শেষ সময় যখন ঘনিয়ে আসে ুতখন এই সূরা তেলাওয়াত করতে অসমর্থ হলেও অন্যের কণ্ঠে এর তেলাওয়াত শুনে আল্লাহর প্রেমে হৃদয় ভরে পরম বিশ্বাস ও ভক্তি সহকারে জীবন-বিধাতার চরম-প্রান্তে নিজেকে সমর্পণ করে দেয়। সূরা ‘তোয়াহা’ এবং সূরা ‘আর-রহমান’ সম্মান ও মর্যাদায় মুসলমানের হৃদয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দখল করে থাকলেও ‘ইয়াসীন’ নামের এই সূরাটি প্রথম স্থান অধিকার করে রেখেছে। আমরা জানি, প্রত্যেক মানুষের জন্যই মৃত্যু অবধারিত। মৃত্যুর সময় কি করা এবং মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কি শিখানো বা কি শোনানো দরকার এসম্পর্কে হাদিসে বহু আলোচনা রয়েছে। যেমন, হজরত জাবের বিন জায়েদ (রা.) বলেছেন, মূমূর্ষ ব্যক্তির কাছে বসে মৃত্যুর সময় কুরআন পাকের সূরায়ে ইয়াসীন ও রায়াদ তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। এর দ্বারা মূমূর্ষ ব্যক্তি শান্তি অনুভব করে এবং তার মানসিক অবস্থা ঠিকমত বহাল থাকে। এ সম্পর্কে হজরত শেয়রি (রা.) বলেন, মদীনায় আনসারগণ মূমূর্ষ ব্যক্তির মৃত্যুবরণ করার আগে তার শিয়রে বসে সূরা বাকারা পাঠ করতে থাকতেন। আর প্রিয় নবীজি (স.) তাঁর জীবদ্দশায় মৃত ব্যক্তির জন্য মৃত্যু হওয়ার কিছু সময় আগে দোয়া করতেন, ”হে আল্লাহ! আপনি এই মূমূর্ষ ব্যক্তিকে মাফ করুন। এর শয়নের জায়গা ঠান্ডা রাখুন। কবরকে প্রশস্ত করুন। মৃত্যুর পরে শান্তিতে রাখুন। এ আÍাকে পুণ্যবানদের আÍার সঙ্গে মিলিত করুন। আর আখেরাতে আমাকে এবং এই ব্যক্তিকে কাছাকাছি স্থান করে দিন। তাকে দুঃখ-কষ্ট বিপদাপদ থেকে বাঁচিয়ে রাখুন”।