বিশ্বকাপে ট্রেনে ৯ মাইল যেতে-আসতে গুনতে হবে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা!

টিকিটের আকাশ ছোঁয়া দামই শুধু নয়, বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো মাঠে বসে দেখার জন্য এবার ভক্তদের পকেট আরও অনেকভাবে খালি হতে যাচ্ছে। এই যেমন মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে নিউ ইয়র্ক সিটি পর্যন্ত যাওয়া আসার ট্রেনের ভাড়া। প্রত্যেক ম্যাচের জন্য রাউন্ড ট্রিপে ভক্তদের গুনতে হবে ১৫০ ডলার, মানে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা! ম্যানহ্যাটনের পেন স্টেশন থেকে নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের স্টেডিয়ামের দূরত্ব ৯ মাইল, যেতে লাগে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। যেখানে যেতে সাধারণত ট্রেন ভাড়া লাগে ১২.৯০ ডলার বা ষোলো শ টাকা। কিন্তু বিশ্বকাপ চলাকালে ভাড়া বেড়ে দাঁড়াবে ১২ গুন বেশি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পরিবহন কর্মকর্তারা। ভেন্যুর আশেপাশে পার্কিং করার সুযোগ বেশিরভাগ দর্শকই পাবেন না। তাই প্রত্যেক ম্যাচের জন্য ৪০ হাজার ভক্ত-সমর্থকরা গণপরিবহন ব্যবহার করবে বলে ধারণা নিউ জার্সি অফিসিয়ালদের।

এনএফএল-এর নিউ ইয়র্ক জায়ান্টস ও নিউ ইয়র্ক জেটসের হোম স্টেডিয়ামে হবে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালসহ বিশ্বকাপের আট ম্যাচ। ফুটবলের পরাশক্তি ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইংল্যান্ডের মতো ফুটবল পরাশক্তিসহ আরও কয়েকটি দেশ খেলবে এই ভেন্যুতে। নিউ জার্সি কর্মকর্তা বলেছেন, বিশ্বকাপ আয়োজনের অতিরিক্ত খরচ মেটাতে এই অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা প্রয়োজন ছিল। এনজেড ট্রান্সিট কর্মকর্তারা বলেছেন, টুর্নামেন্ট চলাকালে স্টেডিয়াম থেকে স্টেশনে আনা-নেওয়ার জন্য তারা গণপরিবহন খাতে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ বাইরে থেকে অনুদান পাচ্ছে তারা। বাকি খরচ মেটাতে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না বললেন এনজেড ট্রানজিট প্রেসিডেন্ট ও সিইও ক্রিস কোলুরি।

তিনি বলেছেন, ‘এটি অতিরিক্ত মূল্য আদায় নয়। আমরা আসলেই আমাদের খরচ উসুলের চেষ্টা করছি।’ ডেমোক্র্যাট গভর্নর মিকি শেরিল পরিবহনের খরচ ফিফাকে দেওয়ার আহ্বান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি তা না হয়, তবে আমরা সেইসব নিউ জার্সিয়ানদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিশ্বকাপ টিকিটধারীদের ভুর্তুকি দিতে যাব না।’ কিন্তু ফিফা তার সেই প্রস্তাবে নারাজি জানিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য আয়োজক শহর লস অ্যাঞ্জেলস, ডালাস ও হাউস্টনের উদাহরণ টেনেছে, যাদের পরিবহন ভাড়া অপরিবর্তিত আছে।

এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বোস্টন, যেখানে বিভিন্ন স্থান থেকে জিলেট স্টেডিয়ামে এক্সপ্রেস বাসের ভাড়া গুনতে হবে ৯৫ ডলার। হাজারো ভক্ত ইতোমধ্যে ম্যাসাচুসেটসের রাজধানী থেকে ফক্সবোরোতে অবস্থিত স্টেডিয়ামের কাছে কমিউটার রেল স্টেশন পর্যন্ত ৮০ ডলারের রাউন্ড ট্রিপ টিকিট বুকিং করে ফেলেছে। বোস্টন থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বের এই পথে অন্য সময়ে যেতে-আসতে ভাড়া লাগে ২০ ডলার। জিলেটে ম্যাচের দিন কিংবা অন্য বিশেষ ইভেন্টের সময়ও ভাড়া এরকমই থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপে তা বেড়ে গেছে চার গুণ।

অন্যদিকে লস অ্যাঞ্জেলসে ওয়ান ওয়ে ভাড়া এখানো ১.৭৫ ডলার, আটলান্টায় আড়াই ডলার, হাউস্টনে একক যাত্রায় ১.২৫ ডলার এবং ফিলাডেলফিয়ায় সাবওয়েতে ভাড়া ২.৯০ ডলারই আছে। কানসাস সিটি থেকে শাটলে অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে যাওয়া আসার খরচ মাত্র ১৫ ডলার। মেটলাইফে ভাড়ার এত বড় উল্লম্ফনে আপত্তি জানিয়েছেন নিউ ইয়র্ক সরকারের ক্যাথি হোচুল। তিনি এক্স-এ লিখেছিলেন, ‘এত অল্প সময়ের ট্রেন ভ্রমণে ১০০ ডলারের বেশি ভাড়া আরোপ করা আমার কাছে অনেক বাড়তি মনে হয়েছে।’

একটি ফরাসি সমর্থকগোষ্ঠী এই মূল্য নির্ধারণকে ‘সম্পূর্ণ পাগলামি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘ইরেসিস্টিবলস ফ্রান্সাইস’ নামের ভক্ত সংস্থার মুখপাত্র গুইলাউমে অপ্রেত্রে বলেছেন, ‘পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিদিন খারাপ খবর আসছে। এই ধরনের পাগলামি কতদিন চলবে, সেটা বিস্ময়কর বটে।’ ইংল্যান্ড ফুটবল সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএসএ) প্রধান থমাস কনক্যানন বিবিসি-কে বলেছেন, ‘এই টুর্নামেন্টে যা ঘটছে, তার সবই ভক্তদের ঠকানোর মতো ব্যাপার। একটি ম্যাচে আপনার প্রত্যাশিত খরচের চেয়ে অনেক বেশি আকাশ ছোঁয়া দাম। আমরা এতটা ঠকার আশা করিনি।’

এই বাড়তি ভাড়ার ব্যাপারে প্রথম প্রতিবেদন করে দ্য অ্যাথলেটিক। মেটলাইফ স্টেডিয়াম পর্যন্ত বিকল্প পরিবহনের ভাড়াও অনেক বেশি। ১০ হাজার যাত্রী ধারণক্ষমতার শটল বাসগুলোতে চড়ে ম্যানহাটন বাস টার্মিনাল ও অন্য জায়গা থেকে যাওয়া আসায় খরচ হবে ৮০ ডলার। আমেরিকান ড্রিম মলের নিকটস্থ ৫ হাজার পার্কিং স্পট অগ্রিম বিক্রি হয়েছে বর্তমান ২২৫ ডলার মূল্যে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে পার্কিংয়ের জায়গা বিশাল হলেও বিশ্বকাপ ম্যাচ চলাকালে সেগুলো ব্যবহার করা হবে ফ্যান ভিলেজ, শাটল বাস রাখতে ও ফিফা স্টাফদের জন্য।