বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৫ লজ্জাজনক হার
প্রতিটি বিশ্বকাপই আমাদের জন্য কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেয়, তবে সেই সব স্মৃতি সবসময় উদযাপনের মতো আনন্দদায়ক হয় না। ‘গ্রেটেস্ট শো অর্ন আর্থ’ নামক প্রতিযোগিতায় অম্ল-মধূর অনেক গল্পই অমর হয়ে আছে। মাঠে একদল যখন ট্রফি উঁচিয়ে ধরার উল্লাসে মাতে, ঠিক তখনই অন্য কোনো দল এমন এক নেতিবাচক ইতিহাস তৈরি করে যা কেউ মনে রাখতে চায় না – লজ্জাজনক হার, অবিশ্বাস্য বিপর্যয় আর এমন যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স যা ফুটবল বিশ্বে এক একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকে। সাবেক আয়োজক দেশ থেকে শুরু করে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অভিষেক হওয়া দলের ট্রেজেডি – যারা শুধু ব্যর্থই হয়নি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের নাম লিখিয়েছে বিপর্যয়ের নজির সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার আগে ফিরে দেখা যাক কয়েকটি করুণ সেই ইতিহাস।
বলিভিয়া (১৯৫০)
আজ পর্যন্ত আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপের মধ্যে অন্যতম অদ্ভুত এক আসর ছিল ১৯৫০ ব্রাজিল বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপের ফরম্যাট ছিল একেবারেই ভিন্নরকম – গ্রুপগুলোতে দলের সংখ্যা সমান ছিল না, এমনকি প্রথাগত নকআউট পর্বের বদলে রাখা হয়েছিল একটি ফাইনাল গ্রুপ। ফ্রান্স নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বলিভিয়া পড়ে যায় অদ্ভুত এক ‘দুই দলের’ গ্রুপে। ফলে তাদের ভাগ্য ঝুলে ছিল মাত্র একটি ম্যাচের ওপর, যেখানে প্রতিপক্ষ ছিল সেবারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। ২ জুলাই অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচটি আদতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল না, ছিল উরুগুয়ের একতরফা দাপট। ৮-০ গোলে বলিভিয়াকে বিধ্বস্ত করে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই শেষ করে দেয় উরুগুয়ে। নানা অনিয়ম আর অদ্ভুত সব ঘটনায় ভরা সেই টুর্নামেন্টে বলিভিয়ার এই বিশাল ব্যবধানের হার ইতিহাসের অন্যতম একপেশে লড়াইয়ের মুহূর্ত হিসেবে আজও টিকে আছে।
গ্রিস (১৯৯৪)
চার দশকেরও বেশি সময় পর, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে এক দুঃস্বপ্নময় অভিষেকের সাক্ষী হয় গ্রিস। তাদের সেই বিশ্বকাপ অভিযান সম্ভবত সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই আইকনিক গোলটির কারণে। এই গোলটি ছিল আর্জেন্টিনা দলের হয়ে এই কিংবদন্তির শেষ আন্তর্জাতিক গোল। আর্জেন্টিনার ৪-০ ব্যবধানের জয়ে যে গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হয়ে আছে।
তবে সেটি ছিল গ্রিসের দুর্গতির শুরু মাত্র। এরপর নাইজেরিয়া এবং বুলগেরিয়ার কাছেও তারা হার মানে, এবং কোনো ম্যাচেই একটি গোলও শোধ করতে পারেনি। গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার সময় গ্রিস ১০টি গোল হজম করলেও প্রতিপক্ষের জালে একবারও বল পাঠাতে পারেনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যর্থ দলগুলোর তালিকায় নিজেদের নাম খোদাই করে ফেলে তারা। এই ভরাডুবির প্রতিক্রিয়াও ছিল তাৎক্ষণিক—ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্রই প্রধান কোচ আলকেতাস পানাগুলিয়াস পদত্যাগ করেন।
হাইতি (১৯৭৪)
১৯৭৪ বিশ্বকাপে এমন বেশ কিছু দল অংশ নিয়েছিল যারা বিশ্বমঞ্চে লড়াই করতেই রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল হাইতি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে এসে ক্যারিবিয়ান এই দলটি শুরুতে কিছুটা সম্ভাবনার ঝলক দেখালেও শেষ পর্যন্ত বড় দলগুলোর গতির সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি। ইতালি, পোল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার কাছে বড় ব্যবধানে হেরে তাদের গোল ব্যবধান দাঁড়ায় -১২ । হাইতির এই পারফরম্যান্স সেই সময়ে ফুটবলের উদীয়মান দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর বিশাল ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল।
জায়ার (১৯৭৪)
একই টুর্নামেন্টে এমন একটি দলের অভিষেক হয়েছিল, যাদের পারফরম্যান্সকে আজও অনেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বাজে’ হিসেবে গণ্য করেন; আর সেই দলটি হলো জায়ার। নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ আসরে জায়ার তাদের তিনটি ম্যাচের প্রতিটিতেই হেরেছিল। একটি গোলও করতে না পারা দলটি হজম করেছিল মোট ১৪টি গোল। বিশেষ করে যুগোস্লাভিয়ার কাছে তাদের ৯-০ গোলের হার আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যবধানের পরাজয় হয়ে আছে।
এল সালভাদর (১৯৮২)
আট বছর পর, ১৯৮২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে এল সালভাদরও ঠিক একই পর্যায়ের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। তাদের সেই বিশ্বকাপ যাত্রা সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে উদ্বোধনী ম্যাচেই হাঙ্গেরির কাছে ১০-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারের কারণে। এই একটি ম্যাচের ফলই টুর্নামেন্টে ঘুরে দাঁড়ানোর সব আশা কার্যত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল তাদের। পরবর্তী ম্যাচগুলোতে বেলজিয়াম ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এল সালভাদর কিছুটা লড়াই করতে পারলেও, ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। টুর্নামেন্ট শেষে দেখা যায়, এল সালভাদর মাত্র ১টি গোল করতে পারলেও হজম করেছে মোট ১৩টি গোল; যা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল দলগুলোর তালিকায় উপরের দিকেই আছে।