সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দাম

ইরান যুদ্ধের জেরে বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে বাণিজ্য মন্দা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

কিছু ব্যবসায়ী যুক্তি দিচ্ছেন যে, সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ব্রেন্ট বেঞ্চমার্ক প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। এশিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মূল্য নির্ধারণে ব্যবহৃত এই বেঞ্চমার্কের আকস্মিক বৃদ্ধি এশীয় শোধনাগারগুলোর খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা তাদের আগামী মাসগুলোতে বিকল্প খুঁজতে বা উৎপাদন আরও কমাতে বাধ্য করছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটস জানিয়েছে, সোমবার মে মাসের কার্গোর জন্য দুবাইয়ের ক্রুডের স্পট দাম প্রতি ব্যারেল রেকর্ড ১৫৩.২৫ ডলার নির্ধারিত হয়েছে, যা ২০০৮ সালের ব্রেন্ট ফিউচার্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৭.৫০ ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, এর ফলে সোমবার সোয়াপের (মূল্য ঝুঁকি চুক্তি) তুলনায় দুবাইয়ের প্রিমিয়াম দাঁড়িয়েছে প্রতি ব্যারেলে ৫৬.০১ ডলারে, যা অপরিশোধিত তেলের মোট মূল্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং ফেব্রুয়ারির গড় ৯০ সেন্ট থেকে বেশি।

একইভাবে, ওমানের অপরিশোধিত তেলের (ওমান ক্রুড ফিউচার্স) দাম রেকর্ড ব্যারেলপ্রতি ১৪৭.৭৯ ডলার পৌঁছেছে, যার ফলে দুবাই সোয়াপের তুলনায় এর প্রিমিয়াম দাঁড়িয়েছে প্রতি ব্যারেলে ৫০.৫৭ ডলারে, যা ফেব্রুয়ারির গড় ৭৫ সেন্টের চেয়ে অনেক বেশি। তিনটি বাণিজ্য সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুরবান ফিউচার্সের সাথে দামের বিশাল ব্যবধানের কারণে দুবাইয়ের তেলের দাম বিকৃত দেখাচ্ছে, যা সোমবার প্রতি ব্যারেলে ১১১.৭৬ ডলারে স্থির হয়েছিল।

অ্যানালিটিক্স ফার্ম কেপলারের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় মার্চ মাসে এশিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল রফতানি কমে দৈনিক ১১.৬৬৫ মিলিয়ন ব্যারেলে (বিপিডি) দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির প্রায় ১৯ মিলিয়ন বিপিডি থেকে কম এবং মার্চ ২০২৫-এর স্তরের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ কম।

সরবরাহ ব্যাপক হ্রাস

কিছু শোধনাগার সূত্র এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্ল্যাটস মার্কেট অন ক্লোজ প্রক্রিয়ার সময় সরবরাহের জন্য উপলব্ধ সরবরাহ কমে যাওয়াকে দায়ী করেছে। কারণ সংস্থাটি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তিনটি অপরিশোধিত তেলের গ্রেড তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।

সূত্রগুলোর মধ্যে একজন বলেন, “দুর্বল বাণিজ্যের কারণে এটি একটি অস্বাভাবিক এবং অন্যায্য মূল্য নির্ধারণ।” তিনি আরও বলেন, অবশিষ্ট গ্রেডগুলো- ওমান এবং মুরবান-মধ্যপ্রাচ্যের এবং কিছু রাশিয়ান ব্যারেলের মূল্য নির্ধারণে ব্যবহৃত বেঞ্চমার্কের প্রতিনিধিত্ব করে না।

আরেকটি শোধনাগার সূত্র জানিয়েছে, দুবাই এবং ওমানের বেঞ্চমার্ক ভেঙে যাওয়ায় মে মাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের বাণিজ্য থমকে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির একজন মুখপাত্র একটি ইমেইলে বলেছেন, “প্ল্যাটস দুবাই স্পট মার্কেটে লেনদেন হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সাওয়ার ক্রুডের মূল্যকে প্রতিফলিত করে চলেছে।” তিনি আরও বলেন, এই মাসে প্ল্যাটস এমওসি চলাকালীন কার্যকলাপ বেশ জোরালো ছিল এবং একাধিক কার্গো সরবরাহ করা হয়েছে।

তবে, ব্যবসায়ীরা বলেছেন, প্ল্যাটস উইন্ডোতে কার্গো গ্রহণকারী একমাত্র ক্রেতা হলো টোটালএনার্জিস। বাণিজ্য তথ্যানুযায়ী, এই ফরাসি প্রধান সংস্থাটি এই মাসে ওমান এবং মুরবানের ২৪টি ক্রুড কার্গো অর্থাৎ ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল কিনে নিয়েছে। তবে টোটালএনার্জিস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। প্ল্যাটস সোমবার জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সরবরাহযোগ্যতা এবং প্ল্যাটস দুবাই তেলের বেঞ্চমার্ক পদ্ধতি সম্পর্কে অবিলম্বে মতামত চাইছে।

বিকল্প সরবরাহের জন্য আফ্রিকা-আমেরিকা

এদিকে, এশীয় শোধনাগারগুলো সরবরাহের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠায় আমেরিকা ও আফ্রিকা থেকে আসা অপরিশোধিত তেলের স্পট দাম বেড়েছে। দু’জন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আইসিই ব্রেন্টের তুলনায় ব্রাজিলিয়ান স্পট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড ১২-১৫ ডলার বেড়েছে। অন্যদিকে এপ্রিলে লোড করার জন্য পশ্চিম আফ্রিকার অপরিশোধিত তেলের ফ্রি-অন-বোর্ড ভিত্তিতে প্রিমিয়াম এক মাস আগের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১ ডলার বেড়েছে। তাদের একজন আরও বলেছেন, এরই মধ্যে বেশিরভাগ কার্গো বিক্রি হয়ে গেছে।