ইংল্যান্ডে বেড়েই চলেছে গৃহহীন শরণার্থীর সংখ্যা

ইংল্যান্ডে গত চার বছরে আশ্রয়প্রার্থী থেকে শরণার্থী হওয়া মানুষের মধ্যে গৃহহীন বা গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের সংখ্যা পাঁচ গুণ বেড়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছে, ইংল্যান্ডে ২০২১-২২ অর্থবছরে গৃহহীন বা গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫৬০। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩১০-এ। দাতব্য সংস্থাগুলো বলছে, এই পরিস্থিতি মূলত সরকারের নীতির ‘সরাসরি ফল’। তাদের অভিযোগ, নতুন করে স্বীকৃতি পাওয়া শরণার্থীদের মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে সরকারি আবাসন ছাড়তে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি আশ্রয় আবেদনের সিদ্ধান্ত দ্রুত দেওয়ার ফলে বেশি মানুষ শরণার্থী মর্যাদা পেলেও, তাদের থাকার জায়গা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেই।
সরকার অবশ্য জানিয়েছে, তারা শরণার্থীদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজস্ব বাসস্থানে যেতে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং গৃহহীনতার ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে। এই সংকট এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন পরপর কয়েকটি সরকার যুক্তরাজ্যের চাপগ্রস্ত আশ্রয় ব্যবস্থাকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আবেদন ও আপিলের বিশাল জট জমে আছে। লেবার সরকার সেই জট দ্রুত কমাতে চায়, যার ফলে একদিকে বেশি মানুষ শরণার্থী মর্যাদা পাচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের জন্য বাসস্থান সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। গৃহহীন শরণার্থীদের সহায়তাকারী এক সংস্থা জানিয়েছে, সাহায্য চাইতে আসা অধিকাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণী। তাদের একজন ২৬ বছর বয়সী ইউসরা। সুদানে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসেন তিনি। ইউসরা জানান, যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগেই তার পরিবারের সবাই নিহত হন।
প্রায় পাঁচ মাস সরকার-নির্ধারিত এক আশ্রয় হোটেলে থাকার পর গত আগস্টের শেষ দিকে তিনি শরণার্থী মর্যাদা পান। কিন্তু এরপর থেকে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের রাস্তায় একটি তাঁবুতে রাত কাটাচ্ছেন। ইউসরা বলেন, ‘কখনো কখনো মাতাল লোকজন এসে তাঁবু খুলতে চেষ্টা করে। আমি চিৎকার শুরু করি। ভোর না হওয়া পর্যন্ত ঘুমাতে পারি না।’ তিনি জানান, আবাসন ছাড়ার আগেই স্থানীয় কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু একক প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সামাজিক বাসস্থানের তালিকায় তার অগ্রাধিকার কম। শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার পর একজনকে ২৮ দিনের মধ্যে সরকারি আবাসন ছাড়তে হয় এবং একই সময়ে কাজ খুঁজতে বা ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের জন্য আবেদন করতে হয়। অথচ সরকার নিজেই বলছে, প্রথম কিস্তির ইউনিভার্সাল ক্রেডিট পেতে গড়ে ৩৫ দিন লাগে।
ফলে অনেক শরণার্থী কোনো আয় বা বাসস্থানের ব্যবস্থা করার আগেই আশ্রয় সহায়তা হারান। জাতীয় গৃহহীনতা দাতব্য সংস্থা ক্রাইসিসের নীতি ও প্রচার প্রধান জ্যাসমিন বাসরান বলেন, ‘২৮ দিন মোটেই যথেষ্ট সময় নয়। আমরা শরণার্থীদের মধ্যে গৃহহীনতার সর্বোচ্চ বৃদ্ধি দেখছি।’ তার মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, কারণ সরকারি পরিসংখ্যানে শুধু স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো ঘটনাগুলোই ধরা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল স্বল্পমেয়াদি সমাধান নয়, আশ্রয় নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডাইভারসিটির পরিচালক জ্যাকুই ব্রডহেড বলেন, হোটেলের মতো বেসরকারি ব্যবস্থার বদলে সরকার নিজস্ব অস্থায়ী আবাসনে বিনিয়োগ করলে তা আশ্রয় সংকটের পাশাপাশি সামগ্রিক আবাসন ঘাটতিও কমাতে পারে।