রাশিয়ার বলয় ছেড়ে ইউরোপের পথে আর্মেনিয়া

দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত আর্মেনিয়া। কিন্তু এবার এক নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। ইউরোপের ৩০টির বেশি দেশের নেতা এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জড়ো হচ্ছেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে অংশ নিতে- যা দেশটির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইউরোপীয় পলিটিক্যাল কমিউনিটির শীর্ষ সম্মেলন। পরদিন প্রথমবারের মতো দ্বিপাক্ষিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন-আর্মেনিয়া সম্মেলনে যোগ দেবেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কোস্তা। আর্মেনিয়া এখনও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সদস্য। দেশটিতে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। দেশটি জ্বালানি খাতে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল। তারা রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস পায়। প্রতি হাজার ঘনমিটারের দাম রাখা হয় মাত্র ১৭৭ দশমিক ৫০ ডলার। ইউরোপে একই গ্যাসের দাম প্রায় ৬০০ ডলার।
তবে এই নির্ভরতার মাঝেই ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে আর্মেনিয়া। প্রশ্ন উঠছে-কীভাবে এমন পরিবর্তন সম্ভব হলো? ২০২৩ সালের যুদ্ধ- বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ২০২৩ সালে আজারবাইজানের সঙ্গে সংঘর্ষ। ওই সময়ে নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলে দ্রুত সামরিক অভিযান চালিয়ে আজারবাইজান পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং এক লাখের বেশি আর্মেনীয় বাস্তুচ্যুত হয়। অভিযোগ ওঠে, ওই সময় আর্মেনিয়ার মাটিতে রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও রাশিয়া কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। এমনকি রাশিয়া-নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা জোটও আর্মেনিয়াকে কার্যকর সহায়তা দেয়নি।
আর্মেনিয়ার পার্লামেন্টের এক শীর্ষ নেতা জানান, এই ঘটনার পর দেশটি বুঝতে পারে- তাদের বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামো কার্যকর নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগে আর্মেনিয়া-আজারবাইজান সীমান্ত চুক্তি মধ্যস্থতা করে এবং একটি বেসামরিক পর্যবেক্ষণ মিশনও মোতায়েন করে। এতে আর্মেনিয়ার জনগণের মধ্যে ইউরোপের প্রতি আস্থা বাড়ে। ২০২৫ সালের মার্চে আর্মেনিয়ার পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া শুরু করার আইন পাস করে- যা দেশটির কৌশলগত অবস্থান বদলের স্পষ্ট ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আগস্টে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সই করে, যার লক্ষ্য দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান। একই সঙ্গে ‘ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’ নামে একটি আঞ্চলিক করিডোর পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়, যা ইউরোপের সঙ্গে সংযোগ বাড়াবে। তবে বাস্তবে শান্তি এখনও নাজুক। সাম্প্রতিক সময়ে আজারবাইজান ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করেছে, যা কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
মস্কোর অসন্তোষ
মস্কো স্পষ্টভাবেই আর্মেনিয়ার ইউরোপমুখী অবস্থানকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। ক্রেমলিনে এক বৈঠকে নিকোল পাশিনিয়ানকে সতর্ক করে ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সদস্য থাকা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে রাশিয়া আর্মেনিয়ার খনিজ পানির আমদানি নিষিদ্ধ করেছে- যা অনেকের মতে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্য প্রচারসহ নানা ‘হাইব্রিড হুমকি’ দিয়েও চাপ সৃষ্টি করছে মস্কো।
সামনে নির্বাচন, বাড়ছে ঝুঁকি
আগামী জুনে আর্মেনিয়ায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন একটি বেসামরিক মিশন অনুমোদন দিয়েছে, যার লক্ষ্য- ভুয়া তথ্য, সাইবার হামলা ও বিদেশি প্রভাব মোকাবিলা করা। ইউরোপ কাউন্সিলের মহাসচিব অ্যালাঁ বেরসে সতর্ক করে বলেছেন, আর্মেনিয়ার গণতান্ত্রিক অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও তা এখনো চাপের মুখে রয়েছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: ভারসাম্যের রাজনীতি
ইউরোপ আর্মেনিয়াকে ভিসা সুবিধা ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও নেই পূর্ণ সদস্যপদের সময়সীমা, নেই নিরাপত্তা গ্যারান্টি কিংবা রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, আর্মেনিয়াকে এখনও ‘ভারসাম্যের রাজনীতি’ চালিয়ে যেতে হবে- একদিকে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা, অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। সব মিলিয়ে, ইয়েরেভানের এই সম্মেলন শুধু কূটনৈতিক আয়োজন নয়- বরং এটি আর্মেনিয়ার ভবিষ্যৎ পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মঞ্চ।