বিশ্বকাপ ‘দমন-পীড়ন ও স্বৈরতন্ত্রের মঞ্চে’ পরিণত হতে পারে

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হতে দুই মাসের বেশি সময় বাকি রয়েছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে এবারের আসর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১১ জুন উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। বাংলাদেশ সময় একটায় এ ম্যাচ শুরু হবে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ ‘দমন-পীড়নের মঞ্চ এবং স্বৈরাচারী কার্যকলাপের মঞ্চে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে উঠে এসেছে। বিশ্বকাপে অধিকার রক্ষা ও দমনপীড়ন মোকাবিলায় তিনটি আয়োজক দেশের ভক্ত, খেলোয়াড়, সাংবাদিক, শ্রমিক এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য সংস্থাটির ভাষায় ‘গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর’ বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে, যা বিশ্বকাপে প্রভাব বিস্তার করবে।
আজ লন্ডনভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থার ‘মানবতার জয় আবশ্যক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ভক্ত, খেলোয়াড় এবং অন্যান্য সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য ফিফা এবং আয়োজক দেশসমহূকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যদিও ফিফা প্রত্যেকর জন্য ‘নিরাপদ, অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের অধিকার প্রয়োগে স্বাধীনতা নিশ্চিতের মাধ্যমে টুর্নামেন্টে আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে অ্যামনেস্টি বলছে, এই প্রতিশ্রুতি তিনটি আয়োজক দেশের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পরিস্থিতির ‘তীব্র বিপরীত’, যেখানে নিউ জার্সিতে ফাইনালসহ ৭৮টি ম্যাচ ১১টি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘মানবাধিকার জরুরি অবস্থার’ সম্মুখীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আগ্রাসী নির্বাসন প্রচেষ্টা, নির্বিচারে গ্রেফতার এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)-এর ‘আধাসামরিক ধাঁচের’ অভিযানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
আইসিই-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক গত মাসে ‘বিশ্বকাপের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ হবে বলে জানিয়েছেন। জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে আইসিই-এর আগ্রাসন বিরোধী অভিযানের প্রতিবাদকারী দুই মার্কিন নাগরিককে হত্যার ঘটনায় সৃষ্ট ক্ষোভ সত্ত্বেও এ পদক্ষেপের কথা জানিয়েছিল। এর সঙ্গে উচ্চ মাত্রার সহিংসতার জবাবে মেক্সিকোর প্রতিক্রিয়া শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বিষয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
অ্যামনেস্টি বলেছে, বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী আইভরি কোস্ট, হাইতি, ইরান এবং সেনেগালে নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, পাশাপাশি ইংল্যান্ড ও ইউরোপ জুড়ে থাকা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এছাড়া আয়োজক শহরগুলোর কোনো পরিকল্পনাতেই ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এর সমর্থকদের নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো উদ্যোগের বিষয়টি উল্লেখ করেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই বিশ্বকাপটি ফিফার একসময়কার ‘মাঝারি ঝুঁকির’ টুর্নামেন্ট থেকে অনেক দূরে এবং টুর্নামেন্টের মূল প্রতিশ্রুতি ও আজকের বাস্তবতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান পূরণের জন্য জরুরি প্রচেষ্টার ঘাটতি রয়েছে।
ফিফা এই মাসের শুরুতে বলেছিল, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ইরানের উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপে সব দলের অংশগ্রহণে ‘নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী’ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়াও গত বছর ট্রাম্পকে নতুন সৃষ্ট ‘শান্তি পুরস্কার’ প্রদানের সিদ্ধান্তের জন্য তীব্র সমালোচিত হয়েছে।
অ্যামনেস্টির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার বিভাগের প্রধান স্টিভ ককবার্ন বলেন, ফিফা বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় করলেও, ভক্ত, সম্প্রদায়, খেলোয়াড়, সাংবাদিক এবং কর্মীদের এর মূল্য দিতে বাধ্য করা যায় না।ফুটবল এই মানুষগুলোরই—সরকার, ফিফা বা স্পনসরদের নয়—এবং এই টুর্নামেন্টের কেন্দ্রবিন্দুতে তাদের অধিকারই থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে মাত্র চারটি পক্ষ এখন পর্যন্ত তাদের মানবাধিকার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। যারা এখন পর্যন্ত প্রকাশ করেছে, তাদের কোনোটিতেই নিপীড়নমূলক অভিবাসন প্রয়োগ থেকে সুরক্ষার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। বিশ্বকাপের বাস্তবতা যেন এর মূল প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মেলে, তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান তিনি।