বিপজ্জনক বিশ্বে কৌশলগত পাকিস্তান

ইসলামাবাদে ইরান-মার্কিন আলোচনার আগে ৯ এপ্রিল আইওয়ান-ই-সদর (রাষ্ট্রপতি ভবন)-এর বাইরে একজন নিরাপত্তা কর্মী টহল দিচ্ছেন। গত ৭২ ঘণ্টা অস্বাভাবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের ইরানবিরোধী হামলার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ থামাতে এবং দুই পক্ষকে সমঝোতার পথে আনতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা এখন এক সংকটপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ধারাবাহিক টেলিফোন যোগাযোগ এবং তেহরান সফরের মাধ্যমে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যানেলে আস্থা ও বোঝাপড়া তৈরিতে কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে সৌদি আরব ও তুরস্ক সফরে রয়েছেন, যাতে আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সম্পৃক্ত রাখা যায়।

 

এসব পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট, পাকিস্তান আর পশ্চিম এশিয়ার ঘটনাপ্রবাহে শুধু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না; বরং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তানের এ ভূমিকা স্বীকার করছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বড় সংকট কেবল বহুপাক্ষিকতার দুর্বলতা নয় এটি তো স্পষ্টই। মূল প্রশ্ন হলো- যুদ্ধ, কৌশলগত অবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক সংকটের এ জটিল সময়ে এমন কোনো রাষ্ট্র কি আছে, যারা ন্যূনতম নিয়ম রক্ষা, অস্থিতিশীলতা কমানো এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে?

মধ্যম শক্তিধর দেশগুলো হয়তো পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারবে না, তবে ক্ষতিগ্রস্ত কাঠামোর কিছু অংশ মেরামত করতে পারে। তারা স্থিতিশীলতা আনতে, সংলাপের আয়োজন করতে এবং সমন্বয় গড়ে তুলতে সক্ষম বিশেষ করে যখন বড় শক্তিগুলো নিজেরাই বিভাজন বাড়াচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে ১৯৪৫-পরবর্তী যে আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়ার লক্ষণ স্পষ্ট। জাতিসংঘ সনদে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বেছে বেছে আইন প্রয়োগ, ব্যতিক্রমকে স্বাভাবিক করে তোলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার অবক্ষয়। সার্বভৌমত্ব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যমান, কিন্তু ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি থেকে উদ্ভূত নীতির ওপর আস্থা ক্রমেই কমছে। অস্থিতিশীলতাই যেন এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা।সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাত দ্রুতই একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলছে। এ প্রেক্ষাপটে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। তারা সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে পারে, উত্তেজনা কমাতে পারে এবং কূটনৈতিক পরিসর প্রসারিত করতে পারে যখন বড় শক্তিগুলো সংঘাতমুখী অবস্থানে আটকে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান নিজেকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম শক্তিধর দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। জনসংখ্যাগত গুরুত্ব, সামরিক সক্ষমতা, পারমাণবিক প্রতিরোধ এবং দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও চীনের সংযোগস্থলে ভৌগোলিক অবস্থান সব মিলিয়ে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানকে সরাসরি প্রভাবিত করে জ্বালানি নিরাপত্তা, নৌপরিবহণ, অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর এর প্রভাব পড়ে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের কূটনীতি ছিল সক্রিয় ও সুসংগঠিত। ১৪ এপ্রিল ইসলামাবাদে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক এ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি ২৯ মার্চের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘পশ্চিম এশিয়া কোয়াড’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। এ উদ্যোগ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়; বরং একটি নমনীয় পরামর্শমূলক কাঠামো। তবে এটি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সমন্বয়ও এ বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ৩১ মার্চ বেইজিংয়ে ঘোষিত ‘পাঁচ দফা উদ্যোগ’-এ যুদ্ধবিরতি, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, বেসামরিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। এটি শুধু আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নয়; বরং একটি মধ্যম শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্যোগ, যা শান্তি পুনর্গঠনের একটি কাঠামো তুলে ধরে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ভূমিকা মধ্যস্থতা, আলোচনার স্থান প্রদান এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন একটি মধ্যম শক্তিধর দেশের আদর্শ আচরণ।

২০২৫ সালের মে মাস থেকে পাকিস্তানের এ ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী পদক্ষেপ উভয় ক্ষেত্রেই পাকিস্তান দেখিয়েছে, কীভাবে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলো জটিল পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। পাকিস্তান প্রমাণ করেছে, তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে না পারলেও সংঘাতের মধ্যেও সমঝোতার সম্ভাবনা ধরে রাখতে পারে। আজকের দুর্বল বিশ্বব্যবস্থায় নতুন ধরনের রাষ্ট্রীয় আচরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাকিস্তান সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। সামরিক বাস্তবতা, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং রাজনৈতিক সংযমের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে পাকিস্তান দেখিয়েছে কৌশলগত সক্ষমতা, কূটনৈতিক ধৈর্য ও রাজনৈতিক আস্থা থাকলে এখনো বিশ্বকে বিপর্যয়ের দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ বার্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান সংঘাতময় বিশ্বে পাকিস্তানের পশ্চিম এশিয়া অধ্যায় মনে করিয়ে দেয় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সমর্থন থাকলে কূটনীতি এখনো কার্যকর এবং অপরিহার্য।