চাঁপাইনবাবগঞ্জে জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতে কঠোর নজরদারি: অ্যাপস চালু, কমছে ভোগান্তি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের মার্চের শুরু থেকেই সারাদেশে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। সেই সময় দেশে রমজান মাস থাকায় অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করে। দাম বাড়ার আশঙ্কায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল নিতে লাইন দীর্ঘতর হয়। এর প্রভাব পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জেও। সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় পাশের দেশ ভারতে পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই জ্বালানি তেল পাচার রোধে পরিস্থিতির শুরু থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। সীমান্ত দিয়ে যেন কোনোভাবেই জ্বালানি তেল ভারতে পাচার না হতে পারে সেজন্য চেকপোস্টও বসানো হয়। পাশাপাশি প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাচার রোধে তৎপরতা শুরু করে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে জ্বালানি তেলের দাম বেশি। স্থানভেদে ভারতে জ্বালানি তেলের দাম ১২৫ থেকে ১৪৫ টাকার কাছাকাছি।
এমন পরিস্থিতিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে, তেল মজুত করার অভিযোগ উঠলেও পাচার সম্পর্কিত কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এছাড়া মজুত রোধে জেলার সব ফিলিং স্টেশনেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হয়। কয়েকটি পাম্পকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানাও করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ মজুতকৃত জ্বালানি তেলও উদ্ধার করা হয়। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক জেলার সব পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিযুক্ত করা হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে ৫৩ বিজিবির চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন, ৫৯ বিজিবির মহানন্দা ব্যাটালিয়ন ও ১৬ বিজিবির নওগাঁ ব্যাটালিয়ন। এই তিন ব্যাটালিয়নের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার একাংশ, মহানন্দা ব্যাটালিয়ন শিবগঞ্জের একাংশ ও ভোলাহাট উপজেলা সীমান্ত এবং নওগাঁ ব্যাটালিয়ন গোমস্তাপুর উপজেলার সীমান্ত সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করে।
জ্বালানি তেল নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির শুরু থেকে এই তিন ব্যাটালিয়ন সীমান্তে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি কার্যক্রমও পরিচালনা করে আসছে। ৫৯ বিজিবি সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ভারতীয় ট্রাক তল্লাশি কার্যক্রম শুরু করে। যাতে ভারতীয় ট্রাকগুলো পণ্য খালাস করে খালি ট্রাক নিয়ে ফিরে যাবার সময় বাংলাদেশের জ্বালানি তেল নিয়ে যেতে না পারে। অন্যদিকে জেলা পুলিশ বিভিন্ন রাস্তায় চেকপোস্ট বসায়, মজুত ও পাচার রোধে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পাচার রোধে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক করার পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোর ওপর কড়া নজরদারি রাখা হয়। এছাড়া পাচার রোধে প্রকৃত কৃষকদের কৃষি বিভাগের ও বেসরকারি হাসপাতালের জেনারেটরের জন্য সিভিলে সার্জনের সুপারিশের ভিত্তিতে ডিজেল দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সতর্কতার অংশ হিসেবে কয়েক দফা পাম্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৈঠকও করা হয়।
৫৩ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন— সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল যেন পাচার হতে না পারে সেজন্য বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে। এছাড়াও কেউ অবৈধভাবে মজুত করতে না পারে সে জন্যও বিজিবি কাজ করছে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।
৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম কিবরিয়া এর আগে জানিয়েছিলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
১৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন— পরিস্থিতির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ বিজিবির সদস্যরা সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় আছে। চেকিংয়ের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী জানান— পাচার রোধে সংকট পরিস্থিতির শুরুতেই আমরা জ্বালানি তেল পাম্প মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করেছি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে বিজিবি সতর্ক আছে এবং চেকপোস্ট বসিয়েছে। পুলিশেরও বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট আছে এবং তারাও পাচার রোধে সচেষ্ট আছে। আমরা জেলা প্রশসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক সতর্ক আছি। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা আমাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। যে কোনো ধরনের অপরাধের খবর পেলে আমাদের জানাবেন, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে জ্বালানি তেল সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন— সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই, বরং গতবারের তুলনায় এবার বেশি সরবরাহ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভোক্তাদের মধ্যে একটু মজুত করার একটি প্রবণতা থাকে এবং আতঙ্ক থাকার কারণে একটু বেশি করে তেল নিতে চায়তেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা তেল নিতে আসতেন এবং পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় জমে যেত। এছাড়া কিছু অসাধু লোকজন সুযোগ যে নেয়নি তা নয়। আমরা দেখেছি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মজুতদারি করার একটা চেষ্টা ছিল। আমরা সেটা রোধ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের এখানে দুটি ইন্সিডেন্ট হয়েছিল। যদিও তেলের পরিমাণ খুব বেশি না, তবুও আমরা মোবাইল কোর্ট করে রিকভার করেছি। একটি পেট্রোল পাম্পকে জরিমানাও করা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট প্রতিনিয়তই চলছে। এর পাশাপাশি আমরা নতুন একটি ইনিসিয়েটিভ নিয়েছি। সুষ্ঠুভাবে জ্বালানি বিতরণ সিস্টেম চালু করেছি। বুধবার (৮ এপ্রিল) শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলায় চালু করার পর বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সদর উপজেলায় অ্যাপের মাধ্যমে তেল বিক্রির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ৫০০ টাকার বিনিময়ে মোটরসাইকেল চালকদের ৫ দিনের তেল দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। একজন মোটরসাইকেল চালক ৫ দিনের আগে জেলার অন্য কোনো পাম্পে গেলেও তেল পাবেন না। প্রমাণ হলে তার নম্বরটি ব্লক হয়ে যাবে। এই অ্যাপস চালুর ফলে জনমনে একটা স্বস্তি ফিরে আসছে এবং ভোগান্তি কমে যাবে বলে আশা করছি।
সূত্র: দৈনিক গৌড়বাংলা