চীন-ভারত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র করার সময়ই ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো চীনা প্রেসিডেন্টের এক গোপন চিঠির মাধ্যমে দুপক্ষে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের শুরুতে যখন চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র করছিলেন, তখনই বেইজিং নীরবে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা শুরু করে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুরমুকে ব্যক্তিগতভাবে একটি গোপন চিঠি পাঠিয়েছিলেন। যদিও চিঠি রাষ্ট্রপতি মুরমুর কাছে পাঠানো হয়েছিল, তারপরও চিঠিটির বার্তা দ্রুতই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পৌঁছায়। চিঠিতে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের যে কোনও সম্ভাব্য চুক্তি বেইজিংয়ের স্বার্থে ক্ষতিকর হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট বেইজিংয়ের উদ্যোগ পরিচালনার জন্য একজন প্রাদেশিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। জুনে মোদী সরকার চীনের এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। তখন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য আলোচনা এবং ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি নিয়ে টানাপোড়েন চলছিল। পাশাপাশি জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর ভারতের পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত থামাতে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি করার দাবি নিয়ে সরব হওয়ায় নয়াদিল্লি বিরক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে চীনের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প হঠাৎ ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে সেই কৌশলকেই দুর্বল করে দেন।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ভারত ও চীন ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পরেও সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়। দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত বিরোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর ফলে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সরাসরি যাত্রী ফ্লাইট শুরু হতে পারে। বেইজিং ভারতকে ইউরিয়া সরবরাহে বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চীনা নাগরিকদের পর্যটন ভিসাও পুনরায় চালু করা হয়েছে। অদ্ভুত হলেও, সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের সূচনা ট্রাম্পের শুল্ক নীতি থেকেই হয়েছে—যা মূলত বেইজিং এবং পরে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ছিল। মার্চে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে আহ্বান জানায় “আধিপত্যবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির বিরোধিতা” করার জন্য। শি নিজেই বলেন, “হাতি ও ড্রাগনকে একসঙ্গে নাচানোই একমাত্র সঠিক পথ।”জুলাইয়ে চীনা কর্মকর্তারা একই রূপক ব্যবহার করতে থাকেন। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব দৈনিক গ্লোবাল টাইমস আরেক ধাপ এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক মোকাবেলা করতে দুই এশীয় শক্তির মধ্যে “ব্যালে নৃত্য” করার আহ্বান জানায়। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, মোদী এ সপ্তাহে শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য চীনে যাবেন। সেখানে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। এটি প্রধানমন্ত্রী মোদীর চীনে সাত বছরের বেশি সময় পর প্রথম সফর। এর আগে তারা শেষবার গত বছরের রাশিয়ার কাজান শহরে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে সাক্ষাৎ করেছিলেন। চীনা-গ্লোবাল সাউথ প্রজেক্টের প্রধান সম্পাদক এরিক ওল্যান্ডার রয়টার্সকে বলেন, “শি সম্মেলনকে ব্যবহার করবেন দেখানোর জন্য যে, যুক্তরাষ্ট্র-পরবর্তী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কেমন হতে পারে এবং জানুয়ারি থেকে হোয়াইট হাউজের চীন, ইরান, রাশিয়া ও ভারতের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। তিনি আরও বলেন, “ব্রিকস কতটা ট্রাম্পকে হতবাক করেছে, তা দেখলেই বোঝা যায়—এই জোটগুলো ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই তৈরি।” ২০০১ সালে এসসিও প্রতিষ্ঠার পর এ বছরের সম্মেলনটি সর্ববৃহৎ হবে।