হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের মেঘ

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ‘হরমুজ প্রণালী’ ঘিরে উত্তেজনা এখন চরমে। মাত্র একদিন আগে সাময়িক খুলে দেওয়ার পর শনিবার আবারও এই কৌশলগত জলপথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথে চলাচল করতে পারবে না। কোনো জাহাজ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সেটিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, শনিবার ওমান উপকূলে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ও একটি কন্টেইনার জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। জাহাজটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ গুলিবর্ষণের শিকার হয়েছে। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দিল্লিতে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ভারত সরকার। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, অনেক জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে বা গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিসে সংবাদিকদের বলেন, ইরান আমাদের ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না।
তিনি আরও জানান, ইরানের সাথে বর্তমানে ‘খুব ভালো আলোচনা’ চলছে, তবে তেহরান যদি জলপথকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তবে ওয়াশিংটন নতি স্বীকার করবে না। উল্লেখ্য, গত ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ কার্যকর করছে, যার ফলে এ পর্যন্ত ২৩টি জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি) জানিয়েছে, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু নতুন প্রস্তাব পাওয়া গেছে। তেহরান বর্তমানে এই প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে, তবে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। আগামী ২২ এপ্রিল বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, তাই তার আগেই একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে চাইছে দুই পক্ষ। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, উভয় পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়।
হরমুজ সংকটের সমান্তরালে লেবাননেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, দেশটিতে শান্তিরক্ষা মিশনে থাকা এক ফরাসি সৈন্য বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহ এই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননে ‘ইয়েলো লাইন’ বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে সামরিক তৎপরতা জোরদার করেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই রুটে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি-রয়টার্স