যেভাবে হয় হজে এসে মৃত্যুবরণকারীদের কাফন-দাফন

561

মক্কার মসজিদে হারাম ও মদিনার মসজিদে নববীতে প্রায় প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর এক বা একাধিক জানাজার নামাজ হয়ে থাকে। জানাজার নামাজ ফরজে কেফায়া। ফরজ নামাজ শেষে ‘আস সালাতু আলাল আমওয়াতি ইয়ারহামু কুমুল্লাহ’ বা এই জাতীয় শব্দ বলে জানাজার নামাজের ঘোষণা দেওয়া হয়। হজযাত্রী এবং আশপাশের এলাকার স্থানীয় সৌদি নাগরিক মারা গেলে তাদের জানাজা এই দুই মসজিদে হয়ে থাকে। কোনো কোনো ওয়াক্তে একাধিক জানাজাও হয়ে থাকে। হজযাত্রীরা ফরজ নামাজের পর সঙ্গে সঙ্গে সুন্নত নামাজ শুরু না করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন জানাজার জন্য। এটাই রীতি।
বিদায়ি তাওয়াফ শেষে হাজিরা ফিরতে শুরু করেছেন
চলতি বছর হজ পালন করতে এসে মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত পযন্ত মোট ৮১ বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করেছেন। এর মধ্যে মক্কায় মারা গেছেন ৫৮ জন, মদিনায় ৭ জন, মিনায় ১৬ জন। মৃতদের মধ্যে ৬৫ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী। হজ বুলেটিন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। স্ট্রেস, হজের আমলের চাপ এবং অধিকাংশ হাজি বৃদ্ধ হওয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা এবার বেশি। সৌদি আরবে পবিত্র হজপালন করতে এসে কোনো হজযাত্রী বাড়িতে কিংবা রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অথবা হাসপাতালে মারা গেলে তার মরদেহ দেশে পাঠানো হয় না। তবে লাশ দেশে না পাঠালে মৃত্যুবরণকারী হাজিদের মৃত্যুর সনদ যথাসময়ে তাদের পরিবার বা তাদের প্রতিনিধি কিংবা এজেন্সির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ বিষয়ে প্রত্যেক হজযাত্রী হজ গমনের আবেদনপত্রে অঙ্গীকার করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে তার মৃত্যু হলে মরদেহ এখানেই দাফন করা হবে। কোনো ধরনের ওজর-আপত্তি থাকবে না। এমনকি পরিবার-পরিজনেরও কোনো আপত্তি গ্রহণ করা হবে না।
মক্কা, মিনা ও মুজদালিফায় অবস্থানরত কোনো হজযাত্রী মারা গেলে তার জানাজা হয় মসজিদুল হারামে। মদিনায় মারা গেলে তার নামাজের জানাজা হয় মসজিদে নববীতে। কেউ জেদ্দায় মারা গেলে জানাজা হয় জেদ্দায়। মরদেহের গোসল করানো, কাফন পরানো, জানাজা পড়ানো ও দাফন করাসহ যাবতীয় কাজ নির্দিষ্ট বিভাগ করে থাকে। জান্নাতুল মোয়াল্লা। মসজিদুল হারামের পূর্ব দিকে অবস্থিত মক্কা শরিফের একটি বিখ্যাত কবরস্থান। এই কবরস্থানের কোনো কবর বাঁধানো নয়, নেই কোনো কবরে নামফলক। এখানে অনেক সাহাবির কবর আছে। আছে নবী করিম (সা.)-এর স্ত্রীদের কবর। আগে হজ করতে এসে কেউ মক্কায় মারা গেলে এখানে কবর দেওয়া হতো। স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখন ভিন্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। পবিত্র মক্কার রুশাইফায় রযেছে লাশের গোসল ও কাফন পরানোর ব্যবস্থা। হজপালনকারীদের লাশ বহন করার জন্য সরকারি গাড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশের এখানে কোনো কিছু করতে হয় না। মসজিদে হারামে জানাজার জন্য লাশ গাড়িতে করে কাবা শরিফের দক্ষিণে নবী করিম (সা.)-এর জন্মস্থানের পাশে বাবে ইসমাইলের কাছে রাখা হয়। ফরজ নামাজের পর ইমাম সাহেব লাশ রাখার স্থানে এসে জানাজার নামাজ পড়ান। আরবদের মাঝে লাশ বহরকারী খাটিয়া কাঁধে নেওয়ার আগ্রহ অনেক। এটা তাদের একটি বিশেষ গুণ। এটাকে তারা সৌভাগ্য মনে করে। এজন্য লাশ পরিচিত হওয়া জরুরি নয়। কাবা শরিফের দক্ষিণে মাতাফ সংলগ্ন তুর্কি হারাম। এর ওপরের তলায় মুয়াজ্জিন আযান দেয়। লোক সমাগম বেশি হলে ইমাম সাহেব এখান থেকেই জানাজার নামাজ পড়ান। এখানে ৭/৮ জন পুলিশের পাশাপাশি মাইক পরিচালনার লোক রয়েছে। ইমাম সাহেব যেন সুন্দরভাবে জানাজার নামাজ পড়াতে পারেন, সে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের লোক সমাজে একটি কথার প্রচলন রয়েছে, ‘হজ করতে গিয়ে কেউ যদি মারা যায়, সে মক্কার মাটি পেল।’ এটাকে বেশ সৌভাগ্যের বিষয়ও মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামি শরিয়েতে এমন কথা ও বিশ্বাসের বিশেষ কোনো মর্যাদা নেই। তবে মক্কা অর্থাৎ আল্লাহর ঘরের কাছে দাফন হলে, তিনি যদি সত্যিকার ঈমানদার হয়ে থাকেন- তাহলে এটি তার জন্য একটা মর্যাদার বিষয়। কিন্তু এর জন্য অতিরিক্ত ফজিলতের কোনো কথা বা প্রসঙ্গে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) হাদিসের কোথাও বলেননি। তবে হ্যাঁ, ইহরাম অবস্থায় কেউ মারা গেলে তিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী বলে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে।