নেট নিরপেক্ষতা নীতিমালা ফেলে দেওয়া হচ্ছে

506

ইন্টারনেটে মুক্ত ও সমানভাবে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে জারি করা নেট নিউট্রালিটি আইন রদ করার প্রস্তাব এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশনের (এফসিসি) প্রধান। প্রস্তাবটি পাশ হলে গ্রাহকরা ইন্টারনেটে কোন কনটেন্ট কিভাবে পাবে তা নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ফিরে পাবে দেশটির টেলিকম কোম্পানিগুলো ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন যুগান্তকারী এই আইন জারি করেছিল। গত মঙ্গলবার এফসিসির নতুন প্রধান অজিত পাই আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তাবটি প্রকাশ করেন। প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের টেলিকম কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেট নিউট্রালিটি না থাকলে এসব কোম্পানি এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা (আইএসপি) উচ্চমানের স্ট্রিমিং ও অন্যান্য সেবা পাওয়ার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ দাবি করতে পারবে। তাদের পছন্দমতো কোনো সাইট, অ্যাপ বা সেবা ‘স্লো’ করে দিতে পারবে। আবার পছন্দের প্রতিষ্ঠান বা নিজেদের কনটেন্টের ক্ষেত্রে ফাস্ট লেইন সুবিধা চালু করতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য নতুন পদক্ষেপকে ভোক্তা অধিকারে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অজিত পাইকে এফসিসি প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। পাইয়ের সঙ্গে কমিশনে আছেন আরও দুই রিপাবলিকান সদস্য। অন্য দুইজন ডেমোক্রেট। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আগামি ১৪ ডিসেম্বর ভোটে তার প্রস্তাবটি পাশ হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফোন ও কম্পিউটারে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া বড় কোম্পানিগুলো নেট নিউট্রালিটির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। আর গুগল আর ফেইসবুকের মতো বড় অনলাইন কোম্পানিগুলো এর পক্ষে ছিল কারণ তারা মনে করে নেট নিউট্রালিটি না থাকলে বড় বড় টেলিকম কোম্পানি ও আইএসপিগুলো ইন্টারনেটে গেটকিপার হিসেবে ভূমিকা রাখবে। অবশ্য ধারণা করা হচ্ছে, আইনটি রদ করা হলে ছোটো অনলাইন কোম্পানিগুলোই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ টেলিকম কোম্পানিগুলো সুবিধাজনক সেবার জন্য বেশি অর্থ চাইতে পারে। বড় কোম্পানিগুলো তাদের সাইটের জন্য সেই সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রচুর অর্থ খরচ করতে পারলেও ছোটো কোম্পানিগুলোর জন্য তা সম্ভব হবে না। ওবামা প্রশাসনের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল দাবি করে পাই বলেন, এটা ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের বিস্তারে অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগকে কমিয়ে দিয়েছিল এবং উদ্ভাবনকে অনুৎসাহিত করেছিল। আমার প্রস্তাব অনুযায়ী ফেডারেল গভর্নমেন্ট ইন্টারনেট মাইক্রোম্যানেজিং করা বন্ধ করবে। এর বদলে এফসিসি কেবল দেখবে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা তাদের কাজের বিষয়ে স্বচ্ছ থাকছে কিনা, যাতে গ্রাহকরা তাদের জন্য সর্বোত্তম সেবাটা কিনতে পারে। পাইয়ের প্রস্তাবে অবশ্য বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কনটেন্টের জন্য অর্থ পরিশোধ করতে বলা আর ইন্টারনেট কাউকে তথাকথিত ফাস্ট লেইনের সুবিধা দেওয়া হবে কিনা বা ভোক্তাদের ওয়েব অ্যাকসেসে কোনো বাধা বা ইন্টারনেটের গতি কমাতে দেওয়া হবে কিনা তা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকাশ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) এগুলোর কোনোটা প্রতিযোগিতাবিরোধী বা অ্যান্টিট্রাস্ট নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে বলে বিবেচনা করলে তা নিষিদ্ধ করতে বলতে পারবে। প্রচলিত নীতিমালা ইন্টারনেটে কোনো কনটেন্টে প্রবেশে ভোক্তাদের ব্লক করা, ইন্টারনেট গতি কমিয়ে দেওয়া বা নির্দিষ্ট কোনো কনটেন্টের জন্য বাড়তি অর্থ পরিশোধ করতে বলার মতো কিছু করতে ব্রডব্যান্ড সেবাদাতাদের বাধা দেয়। নিজস্ব কনটেন্টে ব্রডব্যান্ড সেবাদাতাদের প্রাধান্য বন্ধ করা, ইন্টারনেটে মুক্ত ও অবাধ পরিবেশ সৃষ্টি আর ওয়েব কনটেন্টে সবাইকে সমঅধিকার দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই নীতিমালা করা হয়। এই নীতিমালার বিরোধিতা করে আসছিল এটিঅ্যান্ডটি, কমকাস্ট আর ভেরাইজন-এর মতো বড় টেলিকম ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের দাবি, এই নীতিমালা রদ ব্রডব্যান্ড অবকাঠামোয় শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েব জায়ান্ট গুগলের মালিক প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুক এই নীতিমালার বাতিল না করতে পাই-কে আহ্বান জানিয়েছিল। নীতিমালায় থাকা মূল সুরক্ষাগুলো সরানোর এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে ভিডিও স্ট্রিমিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নেটফ্লিক্সও। ওবামা প্রশাসনের সময় এফসিসি প্রধান টম হুইলার নেট নিরপেক্ষতা নীতিমালা গঠনে সমর্থন করেছিলেন। এই নীতিমালা রদের এই পরিকল্পনাকে তিনি লজ্জাজনক ও ধোঁকা বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি এই এফসিসি আর এর নেতৃত্বের জন্য এই পদক্ষেপ ভ-ামির নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে দাবি করেন তিনি। ২০১৬ সালে মার্কিন আপিল আদালত নেট নিরপেক্ষতা নীতিমালার বৈধতা তুলে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ইউএস টেলিকম এ নিয়ে এক মামলা দায়েরর পর আদালত এই পদক্ষেপ নেয়। এই সংগঠন এবার ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক খাতে বিনিয়োগ, পরিসর বাড়ানো আর উন্নয়নের রাস্তা খুলে দিতে অপ্রচলিত ও বাধা সৃষ্টিকারী এই নীতিমালা সরাতে পাই-এর এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। ইউএস হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভস-এর ডেমোক্রেট দলীয় শীর্ষস্থানীয় সদস্য ন্যান্সি পেলোসি বলেন, এফসিসির পদক্ষেপ ভোক্তা স্বার্থের বিপরীতে যাবে।