নগরলক্ষ্মী

72

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কল্পদ্রুমাবদান

দুর্ভিক্ষ শ্রাবস্তীপুরে যবে
জাগিয়া উঠিল হাহারবে,
বুদ্ধ নিজভক্তগণে শুধালেন জনে জনে,
‘ ক্ষুধিতের অন্নদানসেবা
তোমরা লইবে বল কেবা?’

শুনি তাহা রত্নাকর শেঠ
করিয়া রহিল মাথা হেঁট।
কহিল সে কর জুড়ি, ‘ ক্ষুধার্ত বিশাল পুরী,
এর ক্ষুধা মিটাইব আমি
এমন ক্ষমতা নাই স্বামী!’

কহিল সামন্ত জয়সেন,
‘ যে আদেশ প্রভু করিছেন
তাহা লইতাম শিরে যদি মোর বুক চিরে
রক্ত দিলে হ’ত কোনো কাজ —
মোর ঘরে অন্ন কোথা আজ!’

নিশ্বাসিয়া কহে ধর্মপাল,
‘ কী কব, এমন দগ্ধ ভাল,
আমার সোনার খেত শুষিছে অজন্মা – প্রেত,
রাজকর জোগানো কঠিন —
হয়েছে অক্ষম দীনহীন।’

রহে সবে মুখে মুখে চাহি,
কাহারও উত্তর কিছু নাহি।
নির্বাক্‌ সে সভাঘরে ব্যথিত নগরী – ’পরে
বুদ্ধের করুণ আঁখি দুটি
সন্ধ্যাতারাসম রহে ফুটি।

তখন উঠিল ধীরে ধীরে
রক্তভাল লাজনম্রশিরে
অনাথপিণ্ডদসুতা বেদনায় অশ্রুপ্লুতা,
বুদ্ধের চরণরেণু লয়ে
মধুকণ্ঠে কহিল বিনয়ে —

‘ ভিক্ষুণীর অধম সুপ্রিয়া
তব আজ্ঞা লইল বহিয়া।
কাঁদে যারা খাদ্যহারা আমার সন্তান তারা,
নগরীরে অন্ন বিলাবার
আমি আজি লইলাম ভার।

বিস্ময় মানিল সবে শুনি —
‘ ভিক্ষুকন্যা তুমি যে ভিক্ষুণী!
কোন্‌ অহংকারে মাতি লইলে মস্তকে পাতি
এ – হেন কঠিন গুরু কাজ!
কী আছে তোমার কহো আজ।

কহিল সে নমি সবা – কাছে,
‘ শুধু এই ভিক্ষাপাত্র আছে।
আমি দীনহীন মেয়ে অক্ষম সবার চেয়ে,
তাই তোমাদের পাব দয়া —
প্রভু – আজ্ঞা হইবে বিজয়া।

‘ আমার ভাণ্ডার আছে ভরে
তোমা – সবাকার ঘরে ঘরে।
তোমরা চাহিলে সবে এ পাত্র অক্ষয় হবে।
ভিক্ষা – অন্নে বাঁচাব বসুধা —
মিটাইব দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা।