ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে নতুন ভুবনে বালাম

গায়কি একান্তই তাঁর মতো। তাই কারও সঙ্গে তুলনা করতে যাওয়া বৃথা। কিন্তু গায়কি নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে বদলে দেওয়া যায়, ভিন্ন অবয়বে বারবার ফিরে আসা যায় দর্শক-শ্রোতার মাঝে। এর একাধিক উদাহরণ দেওয়া যায় বালামের বেলায়। পুরো নাম বালাম জাহাঙ্গীর। নামের প্রথম অংশ তাঁর পরিচিতির জন্য যথেষ্ট এবং সেই ‘বালাম’ শব্দটি অগণিত সংগীতপ্রেমীর ভীষণ প্রিয়। অনেকে জানান, বালাম শুধু সময়ের আলোচিত শিল্পীই নন, একাধারে সুরকার ও সংগীত পরিচালক। তাই কখন কোন সুরে গাইতে হবে, কোন মূর্ছনায় সংগীতপ্রেমীদের হৃদয় স্পন্দনের উঠানামা করে– তা বালামের খুব ভালোভাবেই জানা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, যে শিল্পী, সুরকার ও সংগীতায়োজক সহজেই শ্রোতার পাল্স বুঝতে পারেন; তাঁর সম্পর্কে শ্রোতারা খুব বেশি কিছু জানার সুযোগ পান না। এই যেমন কদিন আগে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার ‘ও প্রিয়তমা’ গানের জন্য শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পেলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, অথচ এ নিয়ে বালামের অনুভূতি কী? তা জানার সুযোগ হলো ভক্তদের। বালামের কথা থেকে কেবল এটুকু জানা গেছে, এই স্বীকৃতি নিয়ে তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা সবাই আনন্দিত। রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতির জন্য ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার টিম ও ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন। তারপরও এত বড় একটি অর্জন নিয়ে অনেকে যেভাবে উচ্ছ্বাস উল্লাস প্রকাশ করেন, তেমন কিছুই চোখে পড়েনি বালামের বেলায়। আসলে বালামের বেলায় এটাই স্বাভাবিক। কারণ, বরাবরই তিনি নিভৃতচারী; কিছুটা অন্তর্মুখী। সামাজিক মাধ্যমেও সক্রিয় নন বালাম। তাই কখন কী করছেন, সংগীত নিয়ে নতুন পরিকল্পনা, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনা, এমন অনেক বিষয় অজানা থেকে যায়। তবে এটাও সত্যি, প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে নিজেকে তিনি উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর গায়কি আর সংগীতায়োজন থেকে তারই প্রমাণ মেলে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা গেছে বহুবার। সে কারণেই রেনিগেডস ব্যান্ডের বালামের সঙ্গে ওয়াফেইজের বালামকে কখনও মেলানো যায়নি।
একইভাবে একক ক্যারিয়ার গড়ার পরও এই শিল্পী ও সংগীতায়োজককে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ পেয়েছেন শ্রোতারা। ‘ভুবন’ এরপর আরও তিনটি একক অ্যালবামের পাশাপাশি মিশ্র অ্যালবাম ‘প্রেম শিকারি’, ‘আঁধার’, ‘দ্য গুরুস অব লাভ’, ‘ছায়াশিকারি’, দ্বৈত অ্যালবাম ‘বালাম ফিচারিং জুলি’, একক গান ‘চুপচাপ চারিদিক’সহ তাঁর আরও বেশ কিছু আয়োজন সংগীতপ্রেমীদের মনে আজও অনুরণন তুলে যাচ্ছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, যার একের পর এক সৃষ্টি শ্রোতাদের মাঝে সাড়া জাগিয়ে যাচ্ছিল, সেই বালাম হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন গানের ভুবন থেকে। দীর্ঘদিন সেভাবে দেখা মেলেনি নন্দিত এই শিল্পীর। কী হলো, কেন আড়ালে চলে গেলেন বালাম? এই প্রশ্ন যখন অনেকের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল তখনই জানা যায়, গুরুতর অসুস্থ স্ত্রীকে সময় দিতেই সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এরপর অনেক ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে কয়েক বছরের বিরতি ভেঙে নতুনভাবে ফিরলেন বালাম।
‘ও প্রিয়তমা’ গানের মধ্য দিয়ে তুলছেন আলোড়ন। ‘প্রিয়তমা’ ছবির এই গানটি স্বল্প সময়ে শুধু ইউটিউব ট্রেন্ডিংয়ের শীর্ষে জায়গা করে নেয়নি, কোটি কোটি দর্শক-শ্রোতার হৃদয়ও জয় করেছে। কোনালের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া এবং আসিফ ইকবালের লেখা ও আকাশ সেনের সুরের এই গানটি বালামকে এনে দিয়েছে পুনর্জন্মের স্বাদ। সবশেষে এই গানে এনে দিয়েছে সেরা শিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। অথচ এমন সাফল্যের পরও বালাম শুধু এটুকুই বলেন, ‘শ্রোতা আমার গান শুনেছেন, ভালো লাগার কথা প্রকাশ করছেন, ভালোবাসা দিচ্ছেন– এটা পরম পাওয়া। আসলে হঠাৎ করেই ‘ও প্রিয়তমা’ গানটি গাওয়ার সুযোগ এসেছে। নিজেকে উজাড় করে গেয়েছি। এরপর যা হয়েছে, সেটাকে ম্যাজিক ছাড়া আর কিছু বলার নেই।’ বালামের এ কথা যে একটুকু ভুল নয়, তার প্রমাণ মেলে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার পর প্লেব্যাকে নিয়মিত ব্যস্ত হয়ে ওঠায়।
‘প্রিয়তমা’র পর ‘রাজকুমার’ সিনেমায় প্লেব্যাক করে দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছেন তিনি। যার সুবাদে তাঁর শ্রোতার প্রত্যাশা বেড়ে গেছে আরও কয়েক গুণ। আর সেটি বুঝতে পেরে বালামও দীর্ঘ এক যুগ পর অ্যালবাম প্রকাশের ঘোষণাও দিয়েছেন। জানিয়েছেন, আসছে ঈদে পূর্ণাঙ্গ একক অ্যালবাম প্রকাশ করতে যাচ্ছেন তিনি। শিরোনাম ‘মাওলা’। এর প্রতিটি গানের সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন এই শিল্পী নিজেই। তাঁর এই কথা থেকে এটাও অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, পঞ্চম এই একক অ্যালবামের সূত্র ধরে শ্রোতারা বালামকে আরও একবার নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ পাবেন। কেননা, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আনকোরা সংগীতায়োজন তুলে ধরাই নন্দিত এই শিল্পীর লক্ষ্য, যার প্রমাণ মিলেছে বহুবার।