চাঁপাই হর্টিকালচার সেন্টারে গাছের শোকেস ও বারোমাসি ফল

739

পোষ মেনেছে প্রকৃতি মৌসুম, বৃক্ষ-মুগ্ধ দর্শনার্থী
<ডি এম তালেবুন নবী>

গাছ-গাছড়ার শোকেস তৈরি করে অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন গবেষক ড. সাইদুর রহমান। এ কাজে সাফল্য পেতে দেড় থেকে পৌনে দুই একর পুকুরের ৪টি পাড় বেছে নিয়েছেন তিনি। এক পাড়ে পূর্বের দিকে বৃহৎ অফিসকক্ষ ও ডরমেটরি। আর তিন পাড়ে রয়েছে ‘গাছের শোকেস’। এখানে রয়েছে নানান গাছের অপূর্ব মেলবন্ধন। তাছাড়া এখানে আছে প্রায় অর্ধশত জাতের ফুল-ফলের গাছ। তাও আবার দীর্ঘমেয়াদী নয়। যেসব ফলের গাছে ১০ বছরের আগে ফল আসে না। সেইসব গাছে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে ফল আনা। পাশাপাশি গাছের আকার ছোট করে রাখায় সফল হয়েছেন গবেষক ড. সাইফুর রহমান। যেমন বারোমাসি আমড়ার গাছ রয়েছে সারি সারি টবে। পাশাপাশি মাটিতে রোপণ করা এসব ফল গাছের উচ্চতা ৫ থেকে ৬ ফুটের মধ্যে ধরে রাখা। কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি আরও ছোট গাছে বারোমাস ফল ধরানো তার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছেন। দেখলে মনে হবে প্রকৃতি, মৌসুম আর উচ্চতা হার মেনেছে এই গবেষকের কাছে। প্রতিদিন তাই শত শত দর্শক দেখতে আসছে হর্টিকালচারের মধ্যে ধরে রাখা এই বৃক্ষ শোকেস। অফিস থেকে বেরিয়ে বাঁ হাতের পথ ধরে এগুলেই শুরু হবে বিস্ময়। আর এই বিস্ময়ের নাম দেশী শেওড়া গাছ দিয়ে তৈরি পুরো হাতির অবয়ব। আপনাকে থমকে দাঁড়াতে হবে দীর্ঘ সময়। দাঁড়িয়ে দেখতে হবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লতানো শেওড়া গাছ দিয়ে তৈরি এই হাতিকে। দুটো লম্বা দাঁত, আর ছোট ছোট দুটি চোখ, লম্বা শুঁড় দেখে মনেই হবে না যে এটা রক্ত-মাংসের গড়া হাতি নয়। তারপরেই শুরু হবে ছোট ছোট অসংখ্য গাছের সারি, যাতে গোছা গোছা ফুল ধরে রয়েছে। একটু এগিয়ে ডান দিকে মোড় নিলেই চোখে পড়বে ড্রাগন গাছের সারি। এই ড্রাগন গাছ ভিয়েতনাম থেকে আনা হয়েছে। ইতোমধ্যেই প্রায় পাঁচ শ’ ড্রাগন চারা নিয়ে গিয়ে রোপণ করেছে অনেক বৃক্ষ প্রেমিক। প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ৩০ টাকা। ড্রাগন সংলগ্ন জমির এক ধারে চীন থেকে আনা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ-গাছের সারি। অপর অংশে নানান ধরনের সবজির চারা তৈরির বিশাল ক্ষেত্রে। যাতে রয়েছে শীতকালীন শাক-সবজির প্রায় ১৬ ধরনের চারা গাছ। আবার ফিরে আসি গাছ-গাছড়ার শোকেসে। পুকুরের একটি পাড় ধরে বারোমাসি আমড়ার সারি সারি ছোট ছোট গাছ (৪ থেকে ৬ ফুট উঁচু)। হর্টিকালচার প্রধান ড. সাইফুর জানান বারোমাসি আমড়ার দারুণ চাহিদাকে সামনে রেখে কলম করা হয়েছে। প্রতিটির দাম ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোন কারণে কোন কৃষি প্রেমিকের আমড়ার চারাটি বারোমাসি না হলে তা (এমনিতেই) বরিশালের মিষ্টি আমড়ায় রূপান্তর হবে। শহরের বিশিষ্ট নাট্যকার গোলাম রাব্বানী তোতা জানান, হর্টিকালচার থেকে বারোমাসি আমড়ার চারা নিয়ে রোপণ করে মাটির কারণে তা রূপান্তর হয়ে বরিশালের মিষ্টি আমড়ার গাছ হয়ে গেছে। একটি নামকরা হর্টিকালচার সেন্টারের মধ্যে ফল ধরা ছোট ছোট গাছের শোকেস তৈরি করে ড. সাইফুর রহমান সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তিনি শুধু গাছের শোকেস তৈরি করে ক্ষান্ত হননি। এই শোকেস থেকে অর্জিত রাজস্ব প্রতিবছর ছাড়িয়ে যাচ্ছে কয়েক লাখ টাকায়। যার পুরো মালিকানা ভোগ করছে সরকারের রাজস্ব বিভাগ। এক দিকে পুকুরের বিরাট জলাশয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। অপরদিকে অর্ধ শতাধিক ছোট গাছের ফল বিক্রির অর্থ যাচ্ছে সরকারের রাজস্ব খাতে। এই শোকেসের মধ্যে রয়েছে বারোমাসি আমড়া, মাল্টা, জাম্বুরা, সফেদা, একাধিক জাতের লেবু, কামরাঙ্গা ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে নানান জাতের আমের চারা ও অর্ধশতাধিক ফুলের চারা। সবচেয়ে বেশি লোভনীয় ও দৃশ্যমান ফুলের তৈরি বর-কন্যা গেট। এছাড়াও এই হর্টিকালচার সেন্টারে বছরের প্রায় বারোমাসই হাতে-কলমে শিক্ষা নিতে এবং ট্রেনিং গ্রহণে বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি কলেজ, ডিপ্লোমাসহ শিক্ষার্থীরা এসে ভিড় জমায়। তার ডরমেটরিতে অবস্থান নিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ করে এই হর্টিকালচারে। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, ৭২৭২ একর এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৫৬ সালে। ১৯৬৮ সালে বিএডিসির কৃষি খামার। ১৯৭৩ সালে উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডের হাতে হস্তান্তর। ১৯৮২ সাল থেকে হর্টিকালচার সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৮ একরে স্থায়ী বিশাল আম বাগান রয়েছে। ১৪ একর নার্সারি। সবজি উৎপাদনকারী এলাকা ১২ একর। এছাড়াও পুকুর ও ঝিল রয়েছে। নিচু জমির পরিমাণ ৮৭২ একর। আম গাছ রয়েছে ৪৪ জাতের। অন্যান্য গাছের জাত ৩২ ধরনের। মসলা জাতীয় গাছ ৭ ধরনের। শোভাবর্ধন ও অন্যান্য মাতৃজাত গাছ রয়েছে ৩১ ধরনের। নতুন সংগৃহীত আমের জাত ২০টি ও দেশী সংগৃহীত জাত ১২টি রয়েছে বিভিন্ন ফলের মাতৃজাত ২৭টি। ক্লেফট গ্রাফটিং করা হচ্ছে আম, জাম, কামরাঙ্গা, পেয়ারা, আমলকি, বেল, তেঁতুল, লেবু (হাইব্রিড), কাঁঠাল, জলপাই, ডুমুর, কৎবেল, জাবাটিকা, লটকন, ডেওয়া, বাতাবী লেবু ও ডালিমসহ ২৮ জাতের ফল। বিষাক্ত আগাছার সম্প্রসারণ বিষাক্ত আগাছা ‘পার্থোনিয়াম’ সম্প্রসারিত হয়ে ফসলের জমিতে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় এই বিষাক্ত আগাছার আগমন ঘটে জেলার বিভিন্ন স্থানে। জেলার বিভিন্ন আমবাগান, রাস্তার পাশের জমিতে কিংবা বিভিন্ন অযতেœ পড়ে থাকা চাষ অযোগ্য জমিতে এই গাছ ছেয়ে গেছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের অর্ধশতাধিক পাকা রাস্তার ধারে এই গাছের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
লেখক : সাংবাদিক
সুত্র : দৈনিক জনকন্ঠ