কোরআন-শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক নরসিংদীর গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়ি

509

গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৪-১৯১০) ভাই গিরিশচন্দ্র সেন নামে অধিক পরিচিত। আমরা অধিকাংশই তাকে চিনি কোরআন-শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক হিসেবে। জন্ম নরসিংদী জেলার পাঁচদোনাতে। প্রাথমিক পড়া শেষ করে গিরিশচন্দ্র ঢাকার পোগোজ স্কুলে ভর্তি হন। শাস্তি ভীতিতে তিনি বেশিদিন স্কুলে পড়েননি। বাড়িতেই ফার্সি ও আরবি শেখেন। ভাই গিরিশচন্দ্র সেন এর বাড়ির সংস্কার কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বেশ যতœ করে আদি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ইটের সাইজ মিলাতে মাটির টালি ব্যবহার করা হয়েছে। বেঁচে যাওয়া টালিগুলো পাশেই স্তুপ করা। দোতালার ধ্বংসপ্রাপ্ত ছাদ বেশ যতেœর সাথে পুনঃনির্মিত হয়েছে। ছাদের নীচে সাপোর্ট হিসেবে বেশ মোটা কাঠের বীমও ব্যবহƒত হয়েছে। নরসিংদী এলাকার সে সময়ের নির্মাণ রীতি অনুসারে দেওয়ালে কাঠের তাক লাগানোর জন্য নকশা যুক্ত বাটামও লাগানো হয়েছে। খসে পরা প্লাস্টারের রূপ দিতে ঘরের অন্তঃভাগে প্লাস্টার প্রায় শেষের দিকে। রঙটা কি হবে কে জানে। এটি প্রতœতত্ত¦ সংরক্ষন ও জাদুঘর, তাই আদিরূপে কিছু আসবাবও বানানো হয়েছে (আসবাবগুলো কিন্তু সম্প্রতিক কালে বানানো গিরিশচন্দ্র সেন এর ব্যবহƒত নয়)। ভবনে ব্যবহƒত কাঠগুলো পরিরক্ষণ করা নয়।সম্ভবনা খুব দ্রুতই ঘুণ ধরবে। আর কাঠ রাঙান হয়েছে গ্লোসি সিনথেটিক এনামেল দিয়ে। যা গিরিশচন্দ্রের আমলে পাওয়া যেত না। জানালার উপর কার্নিশ হিসেবে কাঠের শেডটুকু বাদ দিলে সংস্কার কাজ বেশ চমৎকার। (জানালায় কাঠের শেড সে আমলের নির্মাণ শৈলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়)। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন মযমনসিংহ জিলা স্কুলে শিক্ষক (দ্বিতীয় প-িত) হিসেবে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে যান। কলকাতায় রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের তৎকালীন প্রচারক কেশবচন্দ্র সেনের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। সে সময় কেশবচন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের নববিধান শাখার প্রধান। তারই প্রভাবে গিরিশচন্দ্র সেন ব্রাহ্ম মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ব্রাহ্মসমাজ তার একনিষ্ঠ গবেষণা ধর্মী কাজের জন্য ‘ভাই’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি কোরআন-শরীফ, মিশকাত শরীফের প্রায অধিকাংশ হাদিস, তাজকিরাতুল আউলিয়া, দিওয়ান-ই-হাফিজ, গুলিস্তাঁ, বুঁস্তা, মকতুব্বত-ই-মাকদুস, শারফ উদ্দিন মুনিবী, মসনভী-ই-রুমী, কিমিয়া-ই-সাদত, গুলশান-ই-আসরার ইত্যাদিসহ বেশকিছু বই বাংলায় অনুবাদ করেন। প্রথম বই ব্রহ্মময়ী-চরিত (জীবনী) প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। দ্বিতীয়টি হিতোপদেশমালা’ (১৮৭১) ধর্ম ও নীতি (১৮৭৩), আকসিরে হেদায়েত (১৮৭৬), তাজকিরাতুল আউলিয়া (১৮৭৭), আকসিরে হেদায়েত থেকে তিনি মুসলিম দরবেশগণের বাণী সঙ্কলন ও অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। নীতিমালা শিরোনামের এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালে। দরবেশদের ক্রিয়া (তাসাউফ), ১৮৭৮ দরবেশদিগের সাধন প্রণালী (১৮৭৯), কোরআনের বাছাই করা আয়াতের অনুবাদ প্রবচনবলী (ধর্ম উপদেশ) প্রকাশিত হয় ব্রাহ্মসমাজ থেকে ১৮৮০ সালে। তিনি কোরআনের অনুবাদ মোট ১২ টি খ-ে সমাপ্ত করেন। ১৮৮১ সালে কোরআনের প্রথম খ-ে প্রকাশিত হয়। প্রথম খ- প্রকাশের সময় অনুবাদকের নাম গোপন রাখা হয়। কারণ অনুবাদক হিসেবে তার নাম প্রকাশ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ৩২ পৃষ্ঠার এই খ-ের মূল্য ছিল মাত্র চার আনা।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে নরসিংদী যাওয়ার সবচেয়ে সহজ ব্যবস্থা ট্রেন। স্টেশন থেকে অটো/সিএনজি তে করে পাঁচদোনা যাওয়া যায়। পাঁচদোনা বাজার গোল চত্বর থেকে মাত্র ৫০০ মিটার মতো দুরুত্তে ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়ি।