কাল্পনিক প্রাণি, ইয়েতি কল্পনা নাকি বাস্তব?

179

বরফাচ্ছন্ন হিমালয় পর্বতমালায় বহুবছর ধরেই এক রহস্যময় প্রাণি মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ইয়েতি নামক এই কাল্পনিক প্রাণি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া না গেলেও মানুষের মনে সে গেঁথে আছে ভালোভাবেই।  ইয়েতি নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় তৈরি হয়েছে সিনেমা। গল্প, উপন্যাসেও এই প্রাণি জীবন্ত হয়ে এসেছে বারবার। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, হিমযুগে পৃথিবীতে মানুষ এবং বানরের মিশ্র আদলে বিশালাকার কিছু প্রাণির বাস ছিল। সম্প্রতি কানাডার একদল গবেষক মাটি খুঁড়ে বিশাল এক পায়ের ছাপ আবিষ্কার করার পর এই ধারণা আরো মজবুত হয়। প্রথম পায়ের ছাপ আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা আরো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও লোকবল নিয়ে খনন কাজ শুরু করে। খননকাজ শেষে কানাডার ওই এলাকায় সর্বমোট ২৯টি পায়ের ছাপের সন্ধান পান তারা। এছাড়া একই জায়গায় তারা মানুষের ব্যবহৃত কিছু হাতিয়ার ও কৃষিযন্ত্র খুঁজে পান। কার্বন রেটিং করে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, পায়ের ছাপগুলো আজ থেকে প্রায় ১৩ হাজার বছর পূর্বের। তখন পৃথিবীতে হিমযুগ চলছিল।  তাহলে আমরা কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, এই পায়ের ছাপগুলো হিমযুগের হিমমানব বা ইয়েতিদেরই? যারা আজও পৃথিবীর কোথাও লুকিয়ে থেকে নিজেদের বংশরক্ষা করে যাচ্ছে।

২০০৮ সালের ২ ডিসেম্বর ভারতের অরুণাচল প্রদেশে কয়েকজন শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ডাকাতরা লুটপাটের পর তাদের হত্যা করে। কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর পুলিশের চোখ কপালে ওঠে! কারণ রিপোর্ট অনুযায়ী, শ্রমিকদের ঘাড় মটকে মেরে ফেলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পুলিশ অনুসন্ধানের জন্য ঘটনাস্থলে গিয়ে মানুষের পায়ের ছাপের চেয়ে বেশ কয়েকগুণ বড় পায়ের ছাপ দেখতে পায়। আজ পর্যন্ত পুলিশ এই পায়ের ছাপের রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি। তবে কি এই শ্রমিকদের খুনি দৈত্যাকার কোনো ইয়েতি? শত সহস্র বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো ইয়েতিকে দেখে ফেলার জন্যই কি এমন করুণ পরিণতি হয়েছিল শ্রমিকদের? ব্যাপারটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, যেহেতু প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষী জীবিত নেই।

ইয়েতি বা বিগফুট শতবছর ধরেই মানুষের আলোচনার অন্যতম বিষয়। লোককথা মতে, এটি দৈত্যাকৃতির এক বিশাল প্রাণি। মানুষ দেখামাত্র মুহূর্তের মধ্যে এরা উধাও হয়ে যায়। বরফ বা জঙ্গলে এত দ্রুত সময়ের মধ্যে কোথায় গায়েব হয়ে যায় তা কেউ জানে না। ভারত, নেপাল এবং তিব্বতের বহু মানুষ ইয়েতি দেখেছেন বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, বানরের মতো দেখতে এই প্রাণি ৭ থেকে ৮ ফুট লম্বা এবং ওজন আনুমানিক ২০০ কেজির উপরে। এরা নাকি আবার মানুষের মতোই হাঁটে।

ইয়েতির অস্তিত্ব সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষ সর্বপ্রথম ধারণা পায় ১৯৩২ সালে। বি.এইচ.হজসেন নামক এক পর্বতারোহী উত্তর নেপালের পাহাড়ি এলাকায় ট্র্যাকিং করছিলেন। তার গাইড হঠাৎ করেই বিশালাকার এক প্রাণি দেখতে পান। প্রাণিটি মানুষের মতো দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটছিল। প্রাণিটি দেখার পরপরই গাইড ভয়ে দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করে। এশিয়াটিক সোসাইটির এক জার্নালে হজসেন এই ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনিই সর্বপ্রথম এই প্রাণির ‘ইয়েতি’ নামকরণ করেন। এদের পা মানুষের পায়ের মতো দেখতে, কিন্তু বিশালাকার হওয়ায় অনেকেই এদের ‘বিগফুট’ নামেও ডাকে।

ব্রিটিশদের ভারত শাসনামলে এই প্রাণি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। নেপালে পর্বতারোহণ করতে আসা অনেকেই পাহাড়ে বরফের মধ্যে রহস্যজনক পায়ের ছাপ দেখতে পান। এগুলো ইয়েতির পায়ের ছাপ বলেই ধারণা করা হয়েছিল। তবে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণের অভাবে ধারণাটি বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। ইয়েতিদের নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ফুটেজটি রজার্স পিটারসন এবং বব কিপলিং ধারণ করেন ১৯৬৭ সালে। ফুটেজে একটি ইয়েতিকে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু তৎকালীন বিজ্ঞানীরা এই ফুটেজটি ভুয়া বলে আখ্যায়িত করেন।

নেপালের অংশ দিয়ে হিমালয়ে আরোহণ করার সময় ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিফটন ইয়েতির পায়ের একটি পরিষ্কার ছবি তুলেছিলেন। ছবিটি নিয়ে তখন অনেক গবেষণা হয়। কিছু সংখ্যক বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল এটা বড় আকৃতির কোনো ভাল্লুকের পায়ের ছাপ। ছবির রহস্য উদ্ঘাটনে এখনও কয়েকজন গবেষক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি একদল হিমালয়ের আশপাশের এলাকা এবং তিব্বতে ইয়েতির মতো দেখতে প্রাণির দেহাবশেষ উদ্ধার করেছেন। উদ্ধারকৃত দেহাবশেষে দাঁত, হাত, লোম, নখ, চুল আছে। নিউ ইয়র্কের বাফেলো স্কুল অব সায়েন্সের প্রফেসর শার্লট উদ্ধারকৃত এসব দেহাবশেষের ডিএনএ টেস্ট করেন। প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী নমুনাগুলোর মধ্যে একটি ছিল ওই এলাকায় বসবাসকারী এক বিশেষ প্রজাতির কুকুরের দেহাবশেষ এবং বাকিগুলো আলাদা আলাদা ৮ প্রজাতির ভাল্লুকের।

তবে এই ডিএনএ টেস্ট শেষ কথা নয়। আমরা ইয়েতির অস্তিত্ব একদম উড়িয়ে দিতে পারি না। কারণ বিশ্বজুড়ে নানা কল্পকাহিনিতে ইয়েতির উপস্থিতি এবং বিভিন্ন জায়গায় ইয়েতির পায়ের ছাপ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি একেবারেই গুজব বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। উল্টোদিকে বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও ইয়েতির অস্তিত্ব সম্পর্কিত এমন কোনো প্রমাণ নেই যার উপর ভিত্তি করে ইয়েতির অস্তিত্ব ঘোষণা করা যায়।

সূত্র: রাইজিংবিডি