এবার ছোট ফরম্যাটে বড় জয়

84

তাড়াহুড়োয় ছিলেন কিনা জানা নেই। তবে সাকিব আল হাসান শেষ ওভার পর্যন্ত ম্যাচটা নিতে চাইছিলেন না। তাইতো মঈন আলীকে পরপর দুই চার মারার পর ক্রিস জর্ডানকে মাথার ওপর দিয়ে চার মেরে লক্ষ্য সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনেন। ইংল্যান্ডকে প্রথমবার টি-টোয়েন্টিতে হারাতে ১৩ বলে ৩ রান দরকার ছিল বাংলাদেশের। জর্ডানের অফস্টাম্পের বাইরের বল কাট করলে বল যায় ফাইন লেগে। সেখান মার্ক উড লাফিয়ে বল আটকানোর চেষ্টায় ব্যর্থ। ১২ বল আগে হাতে ৬ উইকেট রেখে বাংলাদেশ ছুঁয়ে ফেলে ইংল্যান্ডের দেওয়া ১৫৭ রানের লক্ষ্য।

এর আগে দুই দল একটি টি-টোয়েন্টি খেলেছিল। জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ডই। তাই শক্তি, সামর্থ্যে, নামে ইংল্যান্ডকেই এগিয়ে রাখতে হতো। দ্বিপক্ষীয় সিরিজে প্রথমবার মুখোমুখিতেই বাংলাদেশ জিতল ম্যাচ। তাদেরকে হারিয়ে টেস্ট খেলুড়ে সবগুলো দেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে জয়ের বৃত্ত ভরাট করার পথে একধাপ এগিয়ে গেল। সামনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে পারলে এই চক্র পূরণ হবে।

বাংলাদেশের ম্যাচ জয়ের নায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ওয়ানডেতে দুই ফিফটি পাওয়া শান্ত এদিন ভিন্ন রূপে ধরা দেন। বিপিএলে সর্বোচ্চ ৫১৬ রান করলেও তার স্ট্রাইক রেট নিয়ে অনেক কথা হচ্ছিল। সব সমালোচনা থেমে গেল তার ৩০ বলে ৫১ রানের ঝড়ো ইনিংসে। ১৭০ স্ট্রাইক রেটে সাজানো ইনিংসেই বলে দিচ্ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাসে থাকা একজন ব্যাটসম্যান চাইলেই যে কোনো সময় বিধংসী ব্যাটিংটাও করতে পারেন।

লক্ষ্য নাগালে থাকায় বাংলাদেশের শুরুটা ছিল আত্মবিশ্বাসী। ৮ বছর পর জাতীয় দলে ফিরে নিজের প্রথম বলেই চার হাঁকান রনি তালুকদার। পরবর্তীতে ক্রিস ওকসকে পয়েন্টের ওপর দিয়ে পুল করে পেয়ে যান আরও দুটি বাউন্ডারি। আর্চারের প্রথম ওভারের পঞ্চম বলে আরেকটি চার হাঁকিয়ে নিজের ফর্মের জানান দেন রনি। পেসারদের বিপক্ষে সাবলীল থাকলেও স্পিনার আসার পর ইনিংসটি আর বড় করতে পারেননি। রশিদের গুগলিতে বোল্ড হয়ে ২১ রানে ড্রেসিংরুমে ফেরেন। আরেক ওপেনার লিটনও সঙ্গীকে অনুসরণ করেন। ১০ বলে ১২ রান করে আর্চারের শিকার হন।

সেখান থেকে বাংলাদেশকে জয়ের লড়াইয়ে নিয়ে যান শান্ত ও হৃদয়। বিপিএলে দুজন সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে খেলেছিলেন। জুটি বেঁধে প্রচুর রানও করেছেন। সেই রসায়ন টের পাওয়া গেল জাতীয় দলের জার্সিতেও। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের সঙ্গে রানিং বিটিউন দ্য উইকেটে পারস্পারিক বোঝাপড়াও টের পাওয়া গেল।

শান্ত ছিলেন উড়ন্ত। মার্ক উডের এক ওভারেই পরপর চারটি বাউন্ডারি হাঁকান। হৃদয় ক্রিস ওকসকে পরপর দুই বাউন্ডারির পর আলীদ রশিককে সুইপ করে যে ছক্কা উড়ান তা উপচে পড়ে গ্যালারিতে গিয়ে পড়ে। দুজনের ৩৯ বলে ৬৫ রানের জুটিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য তখন পঞ্চাশের নিচে নেমে আসে। মনে হচ্ছিল তারাই খেলা শেষ করে আসবেন।

কিন্তু দ্রুত রান তোলার তাড়ায় দুজন ৪ রানের ব্যবধানে আউট হন। মঈন আলীর বলে ডিপ মিড উইকেটে ক্যাচ দেন ১৭ বলে ২৪ রান করা হৃদয়। ২৭ বলে ফিফটি পাওয়া শান্ত থামেন ৫১ রানে। মার্ক উডের হালকা নিচু হওয়া বলে উইকেট হারান বাংলদেশের জয়ের নায়ক।

শান্ত যখন আউট তখন জয় থেকে ৪৫ রান দূরে। হাতে বল ছিল ৪৬টি। সাকিব ও আফিফ জয়ের বাকি কাজ সারেন অনায়েসে। ২৪ বলে ৬ বাউন্ডারিতে ৩৪ রান করে দারুণ ফিনিশিং করেন সাকিব। ১৩ বলে ১৫ রান তুলে অবদান রাখেন আফিফ।

এর আগে টস জিতে ইংল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানিয়ে দুই অর্ধে দুই রূপে দেখা যায় বাংলাদেশকে। প্রথম ১০ ওভারে ছিল অতিথিদের শাসন। পরের ১০ ওভারে স্বাগতিকদের ফিরে আসার চিত্রনাট্য। ১০ ওভারে মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে ৮০ রান তোলা ইংল্যান্ড শেষে যোগ করতে পারে কেবল ৭৬ রান। শেষ ৫ ওভারে মাত্র ২ বাউন্ডারি। এ সময়ে রান এসেছে মাত্র ৩০। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিশাল ব্যাটিং লাইনআপে যা রীতিমত অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়।

তিন পেসার হাসান মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদের ধ্রুপদী বোলিংয়ে শেষ দিকে ইংলিশদের ব্যাট চড়াও হতে দেয়নি বাংলাদেশ।  হাসান এ সময়ে দুই ওভারে মাত্র ৫ রান দেন। তুলে নেন জস বাটলার ও স্যাম কারানের উইকেট। দুজনই পেসারের লেন্থ বল তুলে মারতে গিয়ে সীমানায় শান্তর হাতে ধরা পড়েন।

মোস্তাফিজ নিজের পছন্দের ফরম্যাটে দেখিয়েছেন কারিশমা। শেষ দিকে রান আটকে রাখার পাশাপাশি বোল্ড করেন বেন ডাকেটকে। শেষ ওভারের প্রথম বলে তাসকিন বোল্ড করেন ক্রিস ওকসকে। এরপর মঈন আর জর্ডান মিলে ৯ রানের বেশি নিতে পারেনি। শেষ বলে মঈনের নিশ্চিত ছক্কা ফিরিয়ে ৪ রান বাঁচিয়েছেন শান্ত।

এর আগে বাটলার ও সল্ট ৮০ রানের জুটি গড়েন। যেখানে বাটলার তাণ্ডব চালান বাংলাদেশের বোলাদের ওপর। সল্ট এগিয়েছেন ধীর গতিতে। তবে দুজনকেই জীবন দিয়েছে স্বাগতিকরা। নাসুম সল্টের ফিরতি ক্যাচ নিতে পারেননি। বাটলার ১৯ রানে জীবন পান সাকিবের হাতে। এরপর দ্যুতি ছড়িয়ে তুলে নেন ফিফটি। ৪২ বলে ৪টি করে চার ও ছক্কায় ৬৭ রান করে থামেন তিনি। সল্ট ৩৫ বলে ৩৮ রান করে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। এ দুই ওপেনার বাদে বেন ডাকেট সর্বোচ্চ ২০ রান করেন।

নিজের প্রথম ২ ওভারে ১৯ রান দেওয়া হাসান মাহমুদ ২৬ রানে ২ উইকেটে বোলিং স্পেল শেষ করেন। বাকিরাও ছিলেন দারুণ। ওভারপ্রতি ছয়ের বেশি রান দিলেও শেষ দিকে আঁটসাঁট বোলিংয়ে লক্ষ্য নাগালে রাখেন। নাসুম, তাসকিন, মোস্তাফিজ, সাকিব প্রত্যেকেই পেয়েছেন ১টি করে উইকেট।