এখন আর উচ্চ স্বরে গান বাজে না

302

একটা সময় গ্রামগঞ্জে, শহর-নগরে, অলিতে-গলিতে, হোটেলে-দোকানে-পাড়ায়-মহল্লায় প্রায়ই গান বাজতে শোনা যেত। আর পহেলা বৈশাখ কিংবা ঈদের মতো বড় উৎসবে তো আয়োজন করে গান বাজতো পাড়া-মহল্লায়। এসব উৎসবে প্রিয় শিল্পীর ক্যাসেট ও পরে সিডি কিনে বাজানোটা একটা নিয়মে পরিণত হয়েছিল। উৎসবের অন্যতম আনন্দও ছিল সাউন্ডবক্সে ফুল ভলিউমে গান বাজানো। আর এভাবেই একটি গান ছড়িয়ে পড়তো চারদিকে। কোন শিল্পীর কোন গান বেশি শ্রোতাপ্রিয় সেটা নির্ণয় করা যেত এসব গান বাজার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। যুগ বদলেছে। প্রযুক্তি ভর করেছে সব কিছুতে। ক্যাসেট মাধ্যমের যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সিডি মাধ্যমও প্রায় বিলুপ্ত। প্রযুক্তির বদৌলতে এখন মানুষ গান শুনছে ডিজিটালি। ইউটিউব এখন গান শোনার সব থেকে বড় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। তবে এ কারণে এখন আগের মতো করে গান আর বাজতে শোনা যায় না। কারণ সিডি মাধ্যম বিলুপ্ত হওয়ার ফলে সিডি প্লেয়ারও কাজে আসে না। পাশাপাশি একইভাবে ল্যাপটপ কিংবা ডেস্কটপের সিডি কিংবা ডিভিডি রোমও বিলুপ্তপ্রায়। কারণ সিডি কিংবা ডিভিডির যুগইতো নেই। তাই গান এখন আর বাজে না উচ্চ স্বরে। ইউটিউবে কিংবা মোবাইলে হেডফোন লাগিয়েই গান শুনছে মানুষ। তাই কোন গানটি যে বেশি শ্রোতাপ্রিয় সেটা বোঝা এখন বেশ কঠিন। এখন গান শোনার পাশাপাশি দেখারও একটি বিষয়। সে কারণে ভিডিওর আধিক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে কোনো গানের ইউটিউব ভিউকেই শ্রোতাপ্রিয়তা বিচারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ধরা হচ্ছে। যদিও এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। কারণ অনেক ভালো গান যেমন কোটি শ্রোতা-দর্শক উপভোগ করে ইউটিউবে। তেমনি অনেক বিলাসী কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পীর ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিও লাখ লাখ ভিউ অতিক্রম করে। এর ফলে শ্রোতাপ্রিয়তা বিচারটা সাধারণ শ্রোতাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি নিয়ে গুণী সংগীতশিল্পী সামিনা চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা যাবে না। তবে আমরা বড় বেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভর হয়ে পড়ছি। যেমন এখন বেশিরভাগ গানেই অ্যাকুস্টিক যন্ত্রের ব্যবহার নেই। লুপ ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে গানের সেই আবেদন আর পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে অডিওর দিকে গুরুত্ব না দিয়ে ভিডিওকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আর ইউটিউবের ভিউ নিয়ে যে প্রতিযোগিতা চলছে সেটা অহেতুক। কারণ সময়ই বলে দেবে কোনটা শ্রোতাপ্রিয় কিংবা কালজয়ী গান। সুতরাং অস্থিরতার মধ্যে না গিয়ে ভালো কথা-সুরের গানে মনোযোগ দেয়া উচিত। আরেক জনপ্রিয় শিল্পী হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল বলেন, আমি প্রযুক্তির পক্ষে। ডিজিটালি গান প্রকাশটা আরও আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল। এদিক দিয়ে আমরা পিছিয়ে গেছি। তবে একটি বিষয় বলবো যে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করতে হবে। ভালো গান করার পেছনে সময় ব্যয় করতে হবে। শুধুমাত্র প্রযুক্তির উপর ভর করে ভালো শিল্পী হওয়া যায় না। আগে ভালো কথা ও সুরের গান করতে হবে। তারপর তার প্রচারণায় ভিডিও করা যেতে পারে। তবে একটি কথা বলতে চাই যে ইউটিউব ভিউ যে যার মতো কাউন্ট করতেই পারে। কিন্তু এটা নিয়ে বড়াই করা ঠিক নয়। কারণ গানের প্রকৃত শ্রোতাপ্রিয়তার বিচার শ্রোতা ও সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে চলতি সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী ইমরান বলেন, আমার কয়েকটি গান কোটির উপর উপভোগ করেছেন দর্শক। আমি একটি কথা বলতে চাই কোটি ভিউ হলেই সে গান শ্রোতাপ্রিয় হবে তা নয়। দেখা গেছে যে গান তেমন কেউ শোনেওনি সেই গানও লাখ লাখ ভিউ হচ্ছে। আসলে গানের শ্রোতাপ্রিয়তা নির্ভর করবে শ্রোতাদের উপর। অনেক বছর পরও যে গানটি মানুষ মনে রাখবে সেটিই আসলে প্রকৃত ভালো গান। সেরকম কিছু করার চেষ্টাই করছি আমি।