আশুরায় করণীয় ও বর্জনীয়

63

আরবি হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে চার মাসে যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ এবং বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন, মহররম তার অন্যতম।
ইসলামি শরিয়তের মানদণ্ডে আশুরার অনেক তাৎপর্য ও ফজিলত রয়েছে। এছাড়া আশুরায় বেশ কিছু করণীয় ও বর্জনীয় কাজও আছে। চলুন জেনে নিই সেই কাজগুলো কী কী-

এই দিনে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুসা (আ.) এর সম্প্রদায় মুক্তি পেয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সমুদ্রের মাঝখানে রাস্তা বানিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে সাহায্য করেছিলেন। এর শুকরিয়াস্বরূপ তারা প্রতিবছর আশুরার দিনে রোজা রাখত। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরতের পর যখন এ বিষয়ে অবগত হন, তখন তিনি বলেন, منكم بموسى احق نحن অর্থাৎ মুসা (আ.) এর আদর্শ পালনে তোমাদের থেকে আমরা বেশি হকদার। তোমরা রোজা রাখলে আমরাও অবশ্যই রাখব। তাই ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্যতার দূরত্ব বজায় রেখে ১০ মহররমের সঙ্গে আগে-পরে আরো একটি রোজা রাখতে সাহাবায়ে কেরামকে আদেশ করেছেন। এ ছাড়া রমজানের রোজার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা মোস্তাহাব পর্যায়ের ঐচ্ছিক ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়।

এছাড়াও আইয়ামে জাহেলিয়া যুগে প্রাচীন আরবদের মধ্যে গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতো এই দিনটি। আশুরার দিন মক্কার মানুষ রোজা রাখতেন এবং কাবাঘরের গিলাফ পরিবর্তন করতেন। এ ছিল আশুরার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

কারবালার শহীদদের স্মরণে শোক প্রকাশ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাতি হজরত হোসাইন (রা.) ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে স্বীয় পরিবার ও অনুসারীদের সঙ্গে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন। ঘটনাক্রমে দিনটি ছিল ৬১ হিজরির ১০ মহররম বা আশুরার দিন। বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর কাছে সহনীয় নয়। তবে একটা শ্রেণি রয়েছে, যারা ১০ মহররম কারবালার শহিদদের স্মরণে শোক প্রকাশ অনুষ্ঠান, মর্সিয়া গাওয়ার ব্যবস্থা এবং তাজিয়া মিছিলের আয়োজন করেন। সেই সঙ্গে বিলাপ-মাতম করে ও বুক চাপড়ে শোক প্রকাশের রীতি পালন করেন। এগুলো কাম্য নয়। এ জাতীয় কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থিত নয় এবং আশুরার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। উপরন্তু এ ব্যাপারে ইসলামের কঠিন হুঁশিয়ারির বর্ণনা এসেছে।

মহররম ও আশুরার ভিত্তিহীন ও দুর্বল হাদিস বর্ণনা

অনেকে মহররম ও আশুরার গুরুত্ব ও ফজিলত আলোচনা করতে গিয়ে অসখ্য কল্পকথা ও দুর্বল হাদিস বলে থাকেন। এমন একটি কথা হলো: ‘যে ব্যক্তি মহররমের প্রথম দশ দিন রোজা রাখে, সে দশ হাজার বছর যাবৎ দিনে রোজা ও রাতে ইবাদতের সাওয়াব পাবে’। এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে তা পাওয়া যায় না। (আল্-লাআলি, ইমাম সুয়ূতি: ২/১০৮-১০৯)

আশুরায় করণীয়

(১) আশুরার দিন রোজা রাখা: আশুরার দিন রোজা রাখলে এক বছরের সগিরাহ গোনাহ মাফের আশা করেছেন স্বয়ং বিশ্বনবী। হাদিসের বর্ণনায় তা উঠে এসেছে- আবু কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজার দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে বিগত বছরের গুনাহ মাফের আশা রাখি’। (মুসলিম, তিরমিজি)

মহররম মাসে রোজা রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাদিসে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর আল্লাহর মাস মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ’। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

(২) ক্ষমার ঘোষণা: আশুরার দিন ও মহররম মাসজুড়ে বেশি তওবা-ইসতেগফার করা। কেননা, এদিন ও মাসের বিশেষ মুহূর্তে তওবাহ-ইসতেগফারে আল্লাহ তাআলা পুরো জাতিকে ক্ষমা করে দেবেন। হাদিসে এসেছে- ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মহররম হলো আল্লাহ তাআলার (কাছে একটি মর্যাদার) মাস। এই মাসে এমন একটি দিন আছে, যাতে তিনি অতীতে একটি সম্প্রদায়কে ক্ষমা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অপরাপর সম্প্রদায়কে ক্ষমা করবেন’। (তিরমিজি)

(৩) ত্যাগ ও কোরবানির শিক্ষা গ্রহণ: দ্বীন ও ইসলামের কল্যাণে হজরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবন থেকে আত্মত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করা সব মুসলমানের জন্য একান্ত করণীয়। সবার মাঝে হজরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর এই ঈমানি চেতনা জাগরিত হলেই ইসলামের পরিপূর্ণ বিজয় আসবে।

(৪) অন্যকে ইফতার করানো: এমনিতে ইফতার করানো অনেক ফজিলতপূর্ণ কাজ। সম্ভব হলে আশুরার দিনে নিজে রোজা রাখার পাশাপাশি রোজা পালনকারীদের ইফতার করানো উত্তম। এ ছাড়া সাধ্যমতো দান-সদকাহ করা। গরিবদের পানাহার করানো। এতিমের প্রতি সদয় ব্যবহার ও সহযোগিতা করা।

(৫) তওবা করা: তওবা কবুল হওয়া এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি, নিরাপত্তা এবং সাহায্য লাভ করার ইতিহাসজুড়ে আছে মহররম মাসের সঙ্গে। হজরত আলি (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! রমজানের পর আপনি কোন মাসে রোজা রাখতে নির্দেশ দেন?

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও, তাহলে মহররমে রোজা রেখো। কেননা, মহররম আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ তাআলা (অতীতে) অনেকের তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অনেকের তওবা কবুল করবেন’। (জামে তিরমিজি: ৭৪১)

হাদিস বিশারদদের মতে, হাদিসে যেদিনের কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে সেটি খুব সম্ভব আশুরার দিন। তবে মানুষের উচিত প্রাত্যহিক জীবনে তওবা-ইস্তিগফারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।

(৬) দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা: আশুরার দিন বেশি বেশি দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা। কারণ এ দরুদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার বংশধরের উপর রহমত এবং বরকত বর্ষণের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট দরখাস্ত করা হয়েছে।

আশুরায় বর্জনীয়

(১) হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর স্মরণে কাল্পনিক তাজিয়া বা নকল কবর বানানো থেকে বিরত থাকা।

(২) তাজিয়া বানিয়ে তা কাঁধে বা যানবাহনে বহন করে মিছিলসহ সড়ক প্রদক্ষিণ করা থেকে বিরত থাকা।

(৩) নকল এসব তাজিয়ার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকা এবং তাজিয়া বা নকল কবরে নজরানা স্বরূপ অর্থ দান করা থেকে বিরত থাকা।

(৪) নিজেদের দেহে আঘাত বা রক্তাক্ত করা থেকে বিরত থাকা।

(৫) শোক বা মাতম করা থেকে বিরত থাকা।

(৬) যুদ্ধসরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে ঘোড়া নিয়ে প্রদর্শনী করা থেকে বিরত থাকা।

(৭) হায় হোসেন, হায় আলি ইত্যাদি বলে বিলাপ, মাতম কিংবা মর্সিয়া ও শোকগাথা প্রদর্শনীর সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বুকে-পেটে-পিঠে ছুরি মেরে রক্তাক্ত করা থেকে বিরত থাকা।

(৮) ফুল দিয়ে সাজানো এসব নকল তাজিয়া বা কবরের বাদ্যযন্ত্রের তালে প্রদর্শনী থেকে বিরত থাকা।

(৯) হজরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহ তাআলা আনহুর নামে ছোট বাচ্চাদের ভিক্ষুক বানিয়ে ভিক্ষা করানো। এটা করিয়ে মনে করা যে, ওই বাচ্চা দীর্ঘায়ু হবে। এটা মহররম বিষয়ক একটি কু-প্রথা।

(১০) আশুরায় শোক প্রকাশের জন্য নির্ধারিত কালো ও সবুজ রঙের বিশেষ পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা।