অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে সবার এগিয়ে আসা উচিত

623

<ড. মোহা. এমরান হোসেন>

বর্তমানে মুসলমানরা অত্যন্ত সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। পেপারের পাতা খুললেই এবং টিভির পর্দা উম্মোচন করলেই আমাদের মুসলমান ভাই ও বোনদের রক্তের গন্ধ ভেসে আসে। যে জাতি এক সময় সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করেছিল সে জাতি আজ অসম্মানের অতল গহবরে নিমজ্জিত। যে জাতি এক সময় প্রত্যক্ষভাবে অর্ধ পৃথিবী এবং পরে াক্ষভাবে সমগ্র পৃথিবী শাসন করেছিল সে জাতি আজ শাসিত, নিপীড়িত, নিগৃহীত, নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম জাতির উপর অকথ্য ও অবর্ণনীয় নির্যাতন চলছে। বিশেষত মিয়ানমানের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে তথাকার পাষ- ও নরপশু বৌদ্ধ সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ মগরা। রাখাইন রাজ্যের মাটি ও বাতাসের সাথে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্ক হাজার বছরের। শুধুমাত্র অসহায় মুসলান হওয়ার কারণেই নাগরিকত্বসহ তাদের সকল অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদেরকে নিধন করতে চাচ্ছে। মানবরূপী শয়তানরা যুবতী নারীদেরকে ধরে নিয়ে জঙ্গলে গিয়ে ধর্ষণ করত হাত পা বেঁধে উপুড় করে ফেলে খাড়া দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে গোড়ালী থেকে পা আলাদা করছে, কব্জি থেকে হাত আলাদা করছে এবং পরিশেষে গলায় ছুরি চালিয়ে দেহ থেকে মাথা আলাদা করে হোলি খেলছে। কাউকে কাউকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারছে। জনম দুঃখিনী মায়ের সামনে ছেলেকে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে, অবুঝ শিশুর সামনে তার পিতাকে জবেহ করছে, পালাতে চেষ্টা করলে গুলি করে হত্যা করছে। শত শত গ্রামে অগ্নি সংযোগ করে শ্মশানে পরিণত করেছে। তাদের নির্যাতন থেকে নিষ্পাপ শিশুরাও রেহায় পাচ্ছে না। সাম্প্রতিক রয়টার্স কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে তারা পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করেছে। রোহিঙ্গাদের নিধনযজ্ঞ ইতিহাসের লজ্জাজনক কালো অধ্যায়।
এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লক্ষ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ইউএনএইচসিআর এর তথ্যমতে রোহিঙ্গা শরনার্থীর সংখ্যা ১০লাখ ছাড়িয়ে যাবে। শরনার্থীদের অধিকাংশই মহিলা ও শিশু। এক পরিসংখ্যান মতে ৭০শতাংশ শিশুই অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ইউনিসেফ থেকে আশংকা করা হচ্ছে যে, দুই লাখ রোহিঙ্গা শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্বজন হারার এবং তাদেরকে পাশবিক কায়দায় নির্যাতন ও হত্যা করার দুঃসহ স্মৃতি ও যন্ত্রণা তাদেরকে তাড়া করছে। তাদের চোখ মুখ থেকে আতঙ্ক যাচ্ছে না। এমনও মহিলা বা শিশু আছে যাদের কোন স্বজন নেই। তারা সর্বহারা, নিঃস্ব। তারা রোদ ও বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অনাহারে ও অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিশেষত ছোট ছোট শিশুরা উপযুক্ত খাবারের অভাবে স্বাস্থ্যহানী ও পুষ্টিহীনতায় ভূগছে, এমনকি যথাযথ চিকিৎসার অভাবে মারাও যাচ্ছে। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। এই অনুভূতি নিয়ে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসা দরকার। অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানো সব ধর্মেই পুন্যের কাজ। হিন্দু ধর্মের সন্যাসী, দার্শনিক, লেখক ও সংগীতজ্ঞ স্বামী বিবেকানন্দ এর একটি পংক্তি আমাদেরকে সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেন- “বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?/জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” বিশেষভাবে আলিম সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মানবদরদী মহানবী (স.) এর একটি উক্তি তুলে ধরতে চাই। তিনি (স.) বলেন- সমগ্র মুসলিম জাতি একটি দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গে ব্যথা হলে পুরো দেহ নিদ্রাহীনতা ও জ্বরের মাধ্যমে সহমর্মিতা প্রকাশ করে। (সহীহুল বুখারী, হাদীছ নম্বর ৫৬৬৫)। অন্যত্র নবী (স.) বলেন- যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজনে এগিয়ে যাবে আল্লাহ তার প্রয়োজনে এগিয়ে যাবে এবং যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের একটি বিপদ দুর করবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহের একটি বিপদ দূর করবে। (সহীহুল বুখারী, হাদীছ নম্বর ২৩১০)। আমরা নবী (স.) এর উম্মাত। আমরা ইসলামী আদর্শের ধারক, বাহক এবং প্রচারক। এই মুহূর্তেই আমাদের উচিত মিয়ানমানের পাষ-দের অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়ানো এবং সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এটি হবে ঈমানী চেতনা। উক্ত অনুভূতিতে উজ্জীবিত হয়ে ইতোমধ্যেই অনেক ব্যক্তি/সংস্থা ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন। আমরা তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। আল্লাহ যেন তাদের শ্রমকে কবুল করেন। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সমস্ত মাদরাসার (আলিয়া, ইসলামিয়া, নূরানীসহ সকল মাদরাসা) শিক্ষক-কর্মচারীদের উদ্যোগে শিক্ষক-কর্মচারী, ছাত্র-ছাত্রী এবং এলাকার সুহৃদ ব্যক্তিদের নিকট থেকে ত্রাণসামগ্রী (১। নগদ অর্থ, ২। চাল, ডাল, চিড়া, ইতাদি খাদ্যদব্য ৩। শিশুদের পুষ্টিকর খাবার এবং ৪। খাবার স্যালাইন) সংগ্রহ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে এবং সে লক্ষ্যে “রোহিঙ্গ ত্রাণ কমিটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ” নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অপরদিকে ইম্পেরিয়াল পলিটেনকি ইনস্টিটিউট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর উদ্যোগে অপর একটি ত্রাণ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ত্রাণ সংগ্রহের কাজ এগিয়ে চলেছে। দেশের ধর্ম বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে সকলের উচিত ঐ সমস্ত কমিটির লোকজনের নিকট যথাসাধ্য ত্রাণ সামগ্রী প্রদান করা। মানবতার প্রতি লক্ষ্য রেখে কোন অমুসলিম ভাই ত্রাণ দিলে আমরা তাদেরকেও সাধুবাদ জনাবো। অসহায় মানুষদের সাহায্যে সকলেই এগিয়ে না গেলে অচিরেই মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে বিষেজ্ঞরা বলছেন। মিয়ানমারের হায়েনাদের পৈশাচিক নির্যাতনে রোহিঙ্গাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। তাদের আত্মচিৎকারে আর হাহাকারের প্রতিধ্বনি কি আমাদের হৃদয়ে ব্যাথা জাগ্রত করে না? সকল ভেদাভেদের গোলাক ধাঁধার দেয়াল ভেঙে আমরা কি এক কাতারে সমবেত হয়ে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করতে পারি না? অতএব বিপর্যস্ত, বিপন্ন ও আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যে সবাই উক্ত উদ্যোগের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করবেন এবং ত্রাণ সংগ্রহে যথাযথ ভূমিকা রাখবেন ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিবেন বলে আমরা আশাবাদী।
লেকক-অধ্যক্ষ, শংকরবাটী হেফজুল উলুম এফ. কে. কামিল মাদরাসা